রক্তাক্ত মে দিবস: শিকাগোর সেই কালো দিনটি

 


১৮৮৬ সালের মে মাস। বসন্তের দখিনা বাতাসের বদলে আমেরিকার শিকাগো শহরের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ আর মেহনতি মানুষের চাপা দীর্ঘশ্বাস। যন্ত্রদানবের করাল গ্রাসে পিষ্ট হতে থাকা শ্রমিকদের রক্তে সেদিন লাল হয়ে উঠেছিল রাজপথ। যে অধিকারকে আজ আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি—দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ—তা কোনো দয়া বা করুণায় মেলেনি; অর্জিত হয়েছিল রক্তের বিনিময়ে। হে মার্কেটের সেই রক্তাক্ত দিনটি শুধু একটি স্থানীয় সংঘাত ছিল না, তা ছিল বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির প্রথম অমোঘ গর্জন।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও কারণ

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে কারখানা মালিকদের মুনাফার পাহাড় বাড়ছিল, কিন্তু সেই ঐশ্বর্যের নিচে চাপা পড়েছিল সাধারণ শ্রমিকের জীবন।

 * অমানবিক কাজের সময়: দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা, কখনো কখনো ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত টানা খাটতে বাধ্য করা হতো।

 * মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা: নামমাত্র মজুরিতে বিপজ্জনক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই শ্রমিকদের অঙ্গহানি বা মৃত্যু ঘটত।

 * দাবি একটাই: ১৮৮৪ সালে ‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়নস’ প্রস্তাব গ্রহণ করে—১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে আট ঘণ্টা কাজের আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। শ্লোগান উঠেছিল: "আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, আট ঘণ্টা বিনোদন।"

আন্দোলনের বিস্তার ও ১ থেকে ৩ মে’র উত্তেজনা

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার প্রায় সাড়ে তিন লাখ শ্রমিক একসঙ্গে ধর্মঘটে নামেন। কেবল শিকাগোতেই প্রায় চল্লিশ হাজার শ্রমিক কাজ বন্ধ করে পথে নামেন। শহর স্তব্ধ হয়ে যায়।

 * ৩ মে, ম্যাককর্মিক রিপার ফ্যাক্টরি: ধর্মঘট ভাঙার জন্য মালিকপক্ষ বহিরাগত শ্রমিক ঢোকানোর চেষ্টা করলে মূল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ কোনো সতর্কতা ছাড়াই আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই দুই শ্রমিক প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন।

 * এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই পরদিন, অর্থাৎ ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়।

হে মার্কেটের সেই কালো রাত ও ঘটনার প্রকৃতি

৪ মে সন্ধ্যায় হে মার্কেট চত্বরে বৃষ্টিভেজা ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যেও হাজার হাজার শ্রমিক জমায়েত হন। সভা চলছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে। মেয়র কার্টার হ্যারিসন নিজেও জমায়েতে উপস্থিত থেকে নিশ্চিত হন যে সেখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই এবং তিনি ফিরে যান।

রাত তখন প্রায় দশটা। শেষ বক্তা স্যামুয়েল ফিল্ডেন যখন বক্তব্য রাখছিলেন, তখনই ১৮০ জনের একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ময়দান খালি করার নির্দেশ দিয়ে এগিয়ে আসে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি পুলিশের সারির দিকে একটি ডায়নামাইট বোমা নিক্ষেপ করে। বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ। এক পুলিশ সদস্য নিহত হন (পরে আরও কয়েকজন মারা যান)। ঘটনার আকস্মিকতায় পুলিশ উন্মত্ত হয়ে নিরস্ত্র শ্রমিকদের ওপর নির্বিচার গুলি চালাতে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাজপথ রক্তে ভেসে যায়; প্রাণ হারান একাধিক শ্রমিক, আহত হন শতাধিক মানুষ। আজও স্পষ্ট নয় বোমটি ঠিক কার নির্দেশে ছোঁড়া হয়েছিল, কিন্তু এর সম্পূর্ণ দায় চাপানো হয় শ্রমিক নেতৃত্বের ঘাড়ে।

ফলাফল ও ইতিহাসের প্রহসনমূলক বিচার

হে মার্কেট ট্র্যাজেডির পর শাসকশ্রেণি শুরু করে নির্মম দমনপীড়ন। কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই আন্দোলনের আটজন শীর্ষ নেতা—অগাস্ট স্পাইজ, অ্যালবার্ট পার্সনস, অ্যাডলফ ফিশার, জর্জ এঞ্জেল, লুই লিং, স্যামুয়েল ফিল্ডেন, মাইকেল শোয়াব এবং অস্কার নিবে—কে গ্রেফতার করা হয়।

 * প্রহসনের বিচার: ১৮৮৭ সালে পক্ষপাতদুষ্ট এক বিচার প্রক্রিয়ায় চারজনকে ফাঁসি দেওয়া হয় (স্পাইজ, পার্সনস, ফিশার ও এঞ্জেল)। ফাঁসির আগের রাতে লুই লিং জেলে আত্মঘাতী হন বলে দাবি করা হয়।

 * ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইজ শেষ যে কথাটি বলেছিলেন, তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে: "এমন এক দিন আসবে, যখন আমাদের নীরবতা সেই কণ্ঠস্বরের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে, যা তোমরা আজ স্তব্ধ করে দিচ্ছ!"

 * পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড স্বীকার করেন যে এই বিচার ছিল এক বড় রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং তিনি জীবিত সাজাপ্রাপ্তদের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রদর্শন করেন।

১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের কংগ্রেসে শিকাগোর শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

উপসংহার

শিকাগোর রাজপথে সেদিন যে তাজা রক্ত ঝরেছিল, তা কেবল ইতিহাসের পাতায় বাঁধাই করা কোনো শুকনো তথ্য নয়; তা ছিল মেহনতি মানুষের আত্মমর্যাদার দলিল। আজ আমরা ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরি কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির আনন্দ উপভোগ করি—তার প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে মিশে আছে হে মার্কেটের সেই নাম না জানা শ্রমিকদের নিঃশব্দ কান্না আর আত্মত্যাগ।

অথচ শতবর্ষ পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতি ও অসংগঠিত শ্রমবাজারে চোখ রাখলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই সেই শোষণমুক্ত পৃথিবী পেয়েছি? ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স’ বা মানসিক শান্তির নামে আজ যখন নিঃশব্দে কাজের সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়, তখন শিকাগোর সেই কালো রাত যেন বারবার ফিরে এসে আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। অগাস্ট স্পাইজের সেই অমর বাণী আমাদের আজও মনে করিয়ে দেয়—অধিকার কেউ উপহার হিসেবে দেয় না, আত্মমর্যাদার দাবি আদায় করে নিতে হয়। রক্তে ভেজা মে দিবস শুধু উদযাপনের লাল নিশান নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিবাদের প্রতীক।

Comments

Popular posts from this blog

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World

মাস্টার ব্লাস্টার: ক্রিকেটের শেষ ব্যাকরণবিদ