একবিংশ শতাব্দীতে কমিউনিজম: একটি মৃত আদর্শ নাকি আগামী দিনের সমাধান?
আজকের চাকচিক্যময় করপোরেট দুনিয়ায় বসে 'কমিউনিজম' বা 'সাম্যবাদ' শব্দটা শুনলে অনেকের মনেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিংবা ইতিহাসের পুরোনো কিছু পাতা ভেসে ওঠে। অনেকেই ধরে নিয়েছেন, পুঁজিবাদের রাজত্বে এই আদর্শটি অনেক আগেই তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই?একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে—বর্তমান বিশ্বের আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই প্রতিনিয়ত কার্ল মার্ক্সের সেই পুরোনো তত্ত্বগুলোকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। একদিকে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বিশ্বের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া, আর অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম—পুঁজিবাদের এই চরম সংকট কি তবে সাম্যবাদের প্রয়োজনীয়তাকে আবার সামনে নিয়ে আসছে?আজকের ব্লগে আমরা কোনো অন্ধ আবেগে নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে আলোচনা করব—একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে কমিউনিজম কি শুধুই খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ একটি মৃত আদর্শ, নাকি এটিই হতে পারে মানবজাতির আগামী দিনের সংকটের আসল সমাধান।
পুঁজিবাদের আধুনিক সংকট ও মার্ক্সবাদের পুনরুত্থান
বর্তমান বিশ্বে ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, তার তুলনায় সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে না বললেই চলে। এই যে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বিশাল দেওয়াল, এটাই কার্ল মার্ক্স তাঁর 'দাস ক্যাপিটাল' বইটিতে বহু বছর আগে ব্যাখ্যা করেছিলেন।আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন কঠোর পরিশ্রম করেও একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পায় না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আসার ফলে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যখাতের বাণিজ্যিকীকরণ মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অনেকেই মনে করছেন, সম্পদের সুষম বণ্টন ছাড়া এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নেই।
বাস্তব পৃথিবীর উদাহরণ: চীন, কিউবা ও কেরালা
কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের কথা বললে আমাদের সামনে কয়েকটি বাস্তব উদাহরণ চলে আসে:চীন: চীন নিজেদের 'সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র' দাবি করলেও তারা মূলত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ (State Capitalism) এবং মুক্ত বাজারের একটি মিশ্র অর্থনৈতিক মডেল ব্যবহার করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।কিউবা: আমেরিকার কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিউবা তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং বিশ্বমানের স্তরে ধরে রাখতে পেরেছে, যা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি বড় সাফল্য।কেরালা (ভারত): খুব কাছে তাকালে ভারতের কেরালা রাজ্যের মডেলটি দেখা যায়, যেখানে বছরের পর বছর ধরে বামপন্থী সরকার মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সূচকে পুরো ভারতের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে।
ভুল ও সীমাবদ্ধতা: ইতিহাস কী শেখায়?
কমিউনিজমের স্বপ্নটি যতোটাই সুন্দর, ইতিহাসে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ততোটাই বিতর্কিত। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে একসময় ব্যবস্থার পতন ঘটেছিল। জোর করে কোনো আদর্শ চাপিয়ে দিলে যে হিতে বিপরীত হয়, ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
তবে কি একবিংশ শতাব্দীতে নতুন রূপের সাম্যবাদ আসবে?
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে হুবহু বিংশ শতাব্দীর সোভিয়েত মডেল ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় এবং তা কেউ আশাও করে না। কিন্তু বর্তমানের 'ডিজিটাল যুগে' সাম্যবাদের ধারণা নতুন রূপ নিতে পারে। একে অনেকে "গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র" (Democratic Socialism) বা "সবুজ সমাজতন্ত্র" (Green Socialism) বলছেন, যেখানে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে রাষ্ট্রের মূল সম্পদ ও সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, কমিউনিজম কোনো মৃত ডাইনোসর নয় যে এটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। যত দিন পৃথিবীতে শোষণ, বৈষম্য এবং শ্রমিকের অধিকার হরণ করার প্রক্রিয়া সচল থাকবে, তত দিন সাম্যবাদের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যাবে না। একবিংশ শতাব্দীর সমাধান হয়তো হুবহু পুরোনো কোনো বইয়ের পাতায় মিলবে না, তবে একটি বৈষম্যহীন এবং মানবিক পৃথিবী গড়তে সাম্যবাদের মূল চেতনাকে বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

Comments
Post a Comment