ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ ও খোরপোশ: হিন্দু ও মুসলিম আইনের খুঁটিনাটি এবং ৪৯৮এ মামলার আসল সত্য

 




ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ ও খোরপোশ: হিন্দু ও মুসলিম আইনের খুঁটিনাটি এবং ৪৯৮এ মামলার আসল সত্য


একটি বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেকোনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। তবে এই মানসিক কষ্টের পাশাপাশি যখন আইনি জটিলতা এসে যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce) এবং খোরপোশের (Alimony) প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল, কারণ এটি সম্পূর্ণভাবে দম্পতির ধর্মের ওপর নির্ভর করে। ভারতের পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক হওয়ায় হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এর নিয়ম ও প্রক্রিয়া আলাদা।

এই ব্লগে আমরা ভারতে হিন্দু ও মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ, খোরপোশ, ম্যাট্রিমোনিয়াল সুট এবং বহুল আলোচিত ৪৯৮এ (498A) মামলার কারণ, প্রকৃতি ও পারস্পরিক সমঝোতা (Mutual Divorce) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।


## অংশ ১: হিন্দু বিবাহ আইন (Hindu Marriage Act, 1955)

এই আইনটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ ধর্মের সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

## ১. বিবাহবিচ্ছেদের প্রকারভেদ ও কারণ (Grounds for Divorce)

হিন্দু আইনে প্রধানত দুইভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হতে পারে:


* কন্টেস্টেড ডিভোর্স (Contested Divorce - একতরফা বিচ্ছেদ): যদি স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে যেকোনো একজন বিচ্ছেদ চান এবং অপরজন রাজি না থাকেন, তবে আদালতে নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করতে হয়। যেমন:

* ক্রুরতা (Cruelty): মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন।

   * ব্যভিচার (Adultery): বিয়ের বাইরে অন্য কারও সাথে স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন।

   * পরিত্যাগ (Desertion): কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া অন্তত ২ বছর ধরে সঙ্গীকে ছেড়ে আলাদা থাকা।

   * ধর্মান্তরকরণ (Conversion): অন্য ধর্ম গ্রহণ করা।

   * মানসিক ব্যাধি (Mental Disorder): এমন মানসিক অবস্থা যার ফলে একসাথে জীবনযাপন করা অসম্ভব।

* মিউচুয়াল ডিভোর্স (Mutual Consent Divorce - পারস্পরিক সম্মতি): ধারা ১৩বি (Section 13B) অনুযায়ী, যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আলাদা হতে রাজি হন। এর জন্য অন্তত ১ বছর আলাদা থাকা বাধ্যতামূলক। এটি সবচেয়ে দ্রুত (৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে) সম্পন্ন হয় এবং এতে মানসিক কষ্ট ও আইনি খরচ দুই-ই কমে।


## ২. আইনি প্রক্রিয়া ও ম্যাট্রিমোনিয়াল সুট (Matrimonial Suit)


* বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার (Section 9) বা বিয়ে বাতিলের জন্য ফ্যামিলি কোর্টে যে দেওয়ানি (Civil) মামলা করা হয়, তাকেই আইনি ভাষায় م্যাট্রিমোনিয়াল সুট বলে।

* মামলা দায়েরের পর আদালত প্রথমে কাউন্সেলিং বা মধ্যস্থতার (Mediation) মাধ্যমে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তা সফল না হলে শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আদালত চূড়ান্ত রায় (Decree) দেয়।


## ৩. ৪৯৮এ (IPC 498A / BNS 85) মামলা ও তার প্রভাব


* কারণ: বিয়ের পর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন যদি যৌতুকের জন্য বা অন্য কোনো কারণে নারীর ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালায়, তবে স্ত্রী এই ফৌজদারি (Criminal) মামলা করতে পারেন।

* প্রকৃতি ও ফলাফল: এটি একটি অ-জামিনযোগ্য (Non-bailable) অপরাধ। আগে এটি ভারতীয় দণ্ডবিধির Section 498A নামে পরিচিত ছিল, যা বর্তমানে নতুন আইন (भारतीय न्याय संहिता) অনুযায়ী BNS Section 85-এর অন্তর্ভুক্ত। দোষী প্রমাণিত হলে ৩ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা হতে পারে।

* মিউচুয়াল ডিভোর্সের সাথে সম্পর্ক: যখন দম্পতি মিউচুয়াল ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন, তখন চুক্তিপত্র (Settlement Deed) অনুযায়ী স্ত্রী এই ৪৯৮এ মামলা এবং স্বামী তাঁর ম্যাট্রিমোনিয়াল সুট প্রত্যাহার করে নেন, যাতে দুজনেই আইনি জটিলতা থেকে দ্রুত মুক্তি পান।


## ৪. খোরপোশ ও ভরণপোষণ (Alimony & Maintenance)


* অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশ (Section 24): মামলা চলাকালীন আদালত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পক্ষকে (স্বামী বা স্ত্রী যে কেউই হতে পারেন, তবে সাধারণত স্ত্রী) নিজের খরচ ও আইনি লড়াইয়ের খরচ চালানোর জন্য এই টাকা দেয়।

* স্থায়ী খোরপোশ (Section 25): বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার সময় এককালীন (Lump sum) বা মাসিক ভিত্তিতে এটি নির্ধারণ করা হয়। স্ত্রী চাকরিজীবী হলেও তাঁর আয় যদি স্বামীর চেয়ে অনেক কম হয়, তবে তিনি খোরপোশ পেতে পারেন। সাধারণত স্বামীর মোট আয়ের ২৫% পর্যন্ত মাসিক খোরপোশ হিসেবে ধার্য করা হতে পারে।


## অংশ ২: মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law)

মুসলিম সম্প্রদায়ের বিবাহ এবং বিচ্ছেদ প্রধানত 'মুসলিম শরিয়ত আইন প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭' এবং 'মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯' (Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939) দ্বারা পরিচালিত হয়।

## ১. বিবাহবিচ্ছেদের প্রকারভেদ ও কারণ

মুসলিম আইনে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:


* স্বামীর দ্বারা বিচ্ছেদ (Talaq): স্বামী নির্দিষ্ট আইনি ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে বিচ্ছেদ ডাকতে পারেন। (উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে একবারে তিন তালাক বা 'তালাক-ই-বিদ্দত' ভারতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ)।

* স্ত্রীর দ্বারা বিচ্ছেদ (Khula - খুলা): স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে থাকতে না চান, তবে তিনি নিজের মেহরের (Dower) অংশ বা কোনো সম্পত্তি ত্যাগ করার বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ চেয়ে নিতে পারেন। এতে স্বামীর সম্মতি প্রয়োজন হয়।

* ** can আদালতের মাধ্যমে স্ত্রীর বিচ্ছেদ (Fasakh / Dissolution of Marriage):** ১৯৩৯ সালের আইন অনুযায়ী, একজন মুসলিম নারী আদালতের দ্বারস্থ হয়ে নিচের কারণগুলিতে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন:

* স্বামী ৪ বছর বা তার বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে।

   * স্বামী ২ বছর ধরে ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে।

   * স্বামীর ৭ বছর বা তার বেশি মেয়াদের জেল হলে।

   * স্বামী কোনো কারণ ছাড়াই ৩ বছর দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।

   * স্বামীর নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতন (Cruelty)।

* পারস্পরিক সম্মতি (Mubarat - মুবারাত): হিন্দু আইনের মিউচুয়াল ডিভোর্সের মতোই, এখানে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। এটি কোর্টের বাইরে বা কোর্টের মাধ্যমেও চূড়ান্ত করা যায়।


## ২. আইনি প্রক্রিয়া ও ম্যাট্রিমোনিয়াল সুট


* মুসলিম মহিলারা ফ্যামিলি কোর্টে 'Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939'-এর অধীনে মামলা (Matrimonial Suit) ফাইল করে আইনি বিচ্ছেদ পেতে পারেন।

* মুবারাত বা খুলার ক্ষেত্রে কাজি বা আদালতের মাধ্যমে চুক্তিপত্র তৈরি করে বিবাহবিচ্ছেদ রেজিস্ট্রি করা হয়।


## ৩. ৪৯৮এ (IPC 498A / BNS 85) মামলা ও মুসলিম আইন


* যদিও এটি একটি সাধারণ ভারতীয় ফৌজদারি আইন (ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য), মুসলিম নারীরাও স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের বিরুদ্ধে ৪৯৮এ ধারা বা নতুন আইনের BNS 85 ধারায় মামলা করতে পারেন।

* মিউচুয়াল ডিভোর্স বা মুবারাত-এর মাধ্যমে আলাদা হওয়ার সময় এই ফৌজদারি মামলাগুলি প্রত্যাহারের শর্ত রাখা হয়, যাতে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি ঘটে।


## ৪. খোরপোশ ও ভরণপোষণ (Maintenance/Alimony)

মুসলিম আইনে খোরপোশের নিয়ম হিন্দু আইনের থেকে কিছুটা ভিন্ন:


* ইদ্দতকালীন রক্ষণাবেক্ষণ: বিচ্ছেদের পর 'ইদ্দত' পিরিয়ড (সাধারণত ৩ মাস বা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত) চলাকালীন স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

* মেহর (Mahr): বিয়ের সময় নির্ধারিত মেহরের টাকা যদি বাকি থাকে, তবে বিচ্ছেদের সময় স্বামীকে তা সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে।

* ইদ্দত পরবর্তী খোরপোশ (মুসলিম মহিলা সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬): এই আইন অনুযায়ী, ইদ্দতকাল পার হওয়ার পরও যদি কোনো মুসলিম নারী পুনর্বিবাহ না করেন এবং নিজের খরচ চালাতে অক্ষম হন, তবে তিনি তাঁর প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে 'ন্যায্য ও উপযুক্ত' (Fair and Reasonable) খোরপোশ দাবি করতে পারেন।

* CrPC 125 / BNSS 144: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী, ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মুসলিম নারীও ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে আজীবন (পুনর্বিবাহ না করা পর্যন্ত) প্রাক্তন স্বামীর কাছে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন।


## সন্তানের কাস্টডি (Child Custody) - উভয় আইনের ক্ষেত্রে

ধর্ম নির্বিশেষে, আদালত সবসময় "সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ" (Best Interest of the Child) দেখে কাস্টডি নির্ধারণ করে। হিন্দু আইনে সাধারণত ৫ বছর পর্যন্ত শিশু মায়ের কাছে থাকে। মুসলিম আইনে (Hizanat) পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে ৭ বছর পর্যন্ত এবং কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মা স্বাভাবিক কাস্টডি পান, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আদালতই নেয়।


## উপসংহার: কেন দীর্ঘ লড়াইয়ের চেয়ে পারস্পরিক সমঝোতা (Mutual Divorce) শ্রেয়?

যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ৪৯৮এ, ম্যাট্রিমোনিয়াল সুট এবং খোরপোশের মতো একাধিক মামলা চলতে থাকে, তখন আইনি লড়াই বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে, যা উভয় পক্ষকেই মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে Mutual Divorce হলো সবচেয়ে সম্মানজনক উপায়।

১. মামলা প্রত্যাহার: পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের চুক্তিতে (Settlement Deed) উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা তুলে নিতে রাজি হয়।

২. এককালীন সমঝোতা: স্থায়ী খোরপোশের অঙ্ক এককালীন চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ নতুন করে কোনো দাবি করতে না পারে।

৩. সময় ও অর্থ সাশ্রয়: একতরফা মামলায় যেখানে ৫ থেকে ১০ বছর লেগে যেতে পারে, সেখানে মিউচুয়াল ডিভোর্সের মাধ্যমে মাত্র ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে আইনিভাবে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সম্ভব।

সতর্কীকরণ: এই ব্লগটি শুধুমাত্র সাধারণ সচেতনতার জন্য। বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত যেকোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ ফ্যামিলি কোর্টের আইনজীবীর (Family Lawyer) পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।



ভারতের বিবাহ বিচ্ছেদ (Divorce) আইন সংক্রান্ত আরও কিছু সুনির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর নিচে দেওয়া হলো। ভারতে ধর্মভেদে বিবাহ এবং বিচ্ছেদের আইন আলাদা (যেমন—হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বা স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট)।


## ১. ডিভোর্স কত প্রকার ও কী কী?

ভারতে মূলত দুইভাবে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করা যায়:


* পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদ (Mutual Consent Divorce): স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই যখন একসঙ্গে বিচ্ছেদে রাজি থাকেন। এটি সবচেয়ে কম সময়ে এবং শান্তিতে সম্পন্ন হয়।

* একতরফা বিচ্ছেদ (Contested Divorce): যখন এক পক্ষ ডিভোর্স চান কিন্তু অন্য পক্ষ রাজি থাকেন না। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু আইনি কারণ (যেমন—নিষ্ঠুরতা, পরকীয়া, বা ত্যাগ করা) প্রমাণ করতে হয়।



## ২. ডিভোর্সের পর সন্তানের কাস্টডি (Child Custody) কে পায়?



* উত্তর: সন্তানের কাস্টডি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং কল্যাণকে (Welfare of the Child) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

* সাধারণত শিশু সন্তানের বয়স ৫ বছরের কম হলে মা-ই প্রথম অগ্রাধিকার পান।

* সন্তান একটু বড় হলে আদালত তার মতামতও জানতে চাইতে পারে। কাস্টডি যে পক্ষই পাক না কেন, অপর পক্ষ সাধারণত সন্তানের সাথে দেখা করার অধিকার (Visitation Rights) পেয়ে থাকেন।



## ৩. খোরপোশ বা অ্যালিমনি (Alimony) কীভাবে নির্ধারিত হয়?



* উত্তর: খোরপোশ বা স্থায়ী ভরণপোষণের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক আইনে বাঁধা নেই। আদালত মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো দেখে এটি নির্ধারণ করে:

* স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের বর্তমান মাসিক আয় ও সম্পত্তির পরিমাণ।

   * বিয়ের পর স্ত্রীর জীবনযাত্রার মান কেমন ছিল।

   * স্ত্রীর নিজের ভরণপোষণ চালানোর যোগ্যতা বা ক্ষমতা আছে কিনা।

   * সাধারণত স্বামীর মোট আয়ের ২৫% এর কাছাকাছি মাসিক খোরপোশ হিসেবে দেওয়ার নজির রয়েছে, তবে এটি মামলার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ পরিবর্তনশীল।



## ৪. ডিভোর্সের মামলা চলাকালীন কি অন্তর্বর্তীকালীন খরচ (Interim Maintenance) পাওয়া যায়?



* উত্তর: হ্যাঁ, মামলা চলাকালীন যদি স্ত্রীর নিজের খরচের কোনো উৎস না থাকে, তবে তিনি আদালতের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ এবং মামলার খরচ (Litigation Expenses) পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। আদালত মামলার চূড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই স্বামীকে এই খরচ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।


## ৫. রেজিস্ট্রি ম্যারেজ বা স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট-এর অধীনে কীভাবে ডিভোর্স হয়?



* উত্তর: যারা কোনো ধর্মীয় রীতি ছাড়া Special Marriage Act, 1954-এর অধীনে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেছেন, তাদের বিচ্ছেদও এই আইনের অধীনেই হয়। এর ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী পারস্পরিক সম্মতিতে এবং ২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী একতরফা বিচ্ছেদের আবেদন করা যায়।



## ৬. 'Irretrievable Breakdown of Marriage' বা সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙন কী?



* উত্তর: এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এতটাই ভেঙে গেছে যে তা আর কোনোভাবেই জোড়া লাগা সম্ভব নয়। যদিও ভারতের মূল পারিবারিক আইনগুলোতে এটি সরাসরি ডিভোর্সের কারণ হিসেবে লিখিত নেই, তবুও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই কারণ দেখিয়ে সরাসরি বিবাহ বিচ্ছেদের মঞ্জুরি দিয়ে থাকে।




## ৭. ডিভোর্সের মামলা করতে কী কী নথিপত্র (Documents) লাগে?

ভারতে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করার জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়:


* পরিচয় এবং ঠিকানার প্রমাণপত্র: স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি বা পাসপোর্টের জেরক্স কপি।

* বিয়ের প্রমাণ: বিয়ের ম্যারেজ সার্টিফিকেট (Marriage Certificate) অথবা বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র (Wedding Card)।

* ছবির প্রমাণ: বিয়ের সময়কার যৌথ ছবি (Joint Photograph) এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

* আলাদা থাকার প্রমাণ: স্বামী-স্ত্রী যে ১ বছর বা তার বেশি সময় ধরে আলাদা থাকছেন, তার প্রমাণ (যেমন—আলাদা বাড়ির ভাড়ার চুক্তিপত্র বা কোনো আইনি নোটিশ)।

* আয়ের প্রমাণ (খোরপোশের দাবির জন্য): গত ৩ বছরের আয়কর রিটার্ন (ITR) ফাইল, বেতনের স্লিপ (Salary Slip), এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট।



## ৮. স্ত্রী চাকরি করলে কি খোরপোশ পেতে পারেন?


* উত্তর: হ্যাঁ, স্ত্রী চাকরি করলেও খোরপোশ পেতে পারেন। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর।

* আইন অনুযায়ী, শুধু স্ত্রী চাকরি করেন বলেই স্বামী খোরপোশ দেওয়া থেকে রেহাই পান না। আদালত দেখে যে স্ত্রীর আয় তার নিজের জীবনধারণ এবং বিয়ের সময়কার জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট কি না।

* যদি স্ত্রীর আয় স্বামীর আয়ের তুলনায় অনেক কম হয় এবং সেই টাকায় তার সম্মানজনকভাবে চলা অসম্ভব হয়, তবে আদালত স্বামীকে ঘাটতি টাকা বা নির্দিষ্ট পরিমাণ খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। তবে স্ত্রী যদি স্বামীর চেয়েও বেশি বা সমপরিমাণ আয় করেন, সেক্ষেত্রে সাধারণত আদালত খোরপোশ মঞ্জুর করে না।



## ৯. ডিভোর্সের পর পুনরায় বিয়ের (Remarriage) নিয়ম কী?

ডিভোর্স চূড়ান্ত হওয়ার পর আবার বিয়ে করার ক্ষেত্রে আইনি নিয়মগুলো নিম্নরূপ:


* মিউচুয়াল ডিভোর্সের ক্ষেত্রে: ফ্যামিলি কোর্ট বা পারিবারিক আদালত থেকে ডিভোর্সের চূড়ান্ত ডিক্রি (Final Decree) হাতে পাওয়ার পরদিনই যে কেউ পুনরায় বিয়ে করতে পারেন। কারণ এই রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণত উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকে না।

* একতরফা (Contested) ডিভোর্সের ক্ষেত্রে: আদালত ডিভোর্সের রায় দেওয়ার পর ৯০ দিন (৩ মাস) অপেক্ষা করতে হয়। এই ৯০ দিন হলো আপিল করার আইনি সময়সীমা। যদি অপর পক্ষ এই ৯০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে কোনো আপিল না করেন, তবেই পুনরায় বিয়ে করা বৈধ।

* যদি অপর পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করেন, তবে সেই আপিল মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না।


Comments

Popular posts from this blog

Artificial Intelligence (AI) and World Politics: How is AI changing power in war or diplomacy?

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World