কেন আর কোনো 'শচীন টেন্ডুলকার' তৈরি হবে না?

 

ক্রিকেটবিশ্বে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা নিত্যদিনের। বিরাট কোহলি কিংবা আধুনিক প্রজন্মের ব্যাটাররা অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় শচীনের বহু ব্যক্তিগত মাইলফলক হয়তো স্পর্শ করে ফেলবেন বা ভেঙেও দেবেন। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়—বিশ্ব ক্রিকেট কি আর কখনো দ্বিতীয় কোনো শচীন টেন্ডুলকার পাবে? উত্তরটা এক বাক্যে: না, আর কখনোই নয়।

এর কারণটি নিছক রান কিংবা সেঞ্চুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে সময়, ক্রিকেট সংস্কৃতির বিবর্তন এবং একটি গোটা জাতির রূপান্তরের ইতিহাস।

১. সময়ের প্রেক্ষাপট: এক বিভক্ত জাতির একক ভরসা

নব্বইয়ের দশকের ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্র আজকের মতো ছিল না। উদারীকরণ পরবর্তী অস্থিরতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগা দেশের কাছে স্বস্তির একমাত্র নাম ছিল শচীন টেন্ডুলকার। গোটা দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ আর বেদনার ভার একাই বইতেন এই কিশোর। তিনি ক্রিজে থাকা মানে ছিল দেশের জয় নিশ্চিত, আর তাঁর আউট হওয়া মানে ছিল এক বিলিয়ন মানুষের টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া। আজ ভারত অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক শক্তিতে আত্মবিশ্বাসী; তাই গোটা দেশকে মানসিক স্থিতি দেওয়ার জন্য আজকের প্রজন্মকে আর কোনো একক ক্রীড়াবিদের ব্যাটের দিকে চেয়ে থাকতে হয় না।

২. দুর্ভেদ্য বোলিং আক্রমণের সোনালী অধ্যায় ও ঝুঁকিপূর্ণ পিচ

শচীন যাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেই পেস ও স্পিন আক্রমণ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ও বৈচিত্র্যময়।

 * ওয়াকার ইউনিস, ওয়াসিম আকরাম ও শোয়েব আখতারের রিভার্স সুইং ও গতির ঝড়

 * গ্লেন ম্যাকগ্রা ও শেন ওয়ার্নের নিখুঁত লাইন-লেন্থ ও ঘূর্ণি

 * কার্টলি অ্যামব্রোস ও কোর্টনি ওয়ালশের মতো দানবীয় পেসারদের বাউন্স

 * মুত্তিয়া মুরালিধরনের রহস্যময় অফ-স্পিন

আধুনিক ব্যাটার-বান্ধব পিচ, ছোট বাউন্ডারি আর আধুনিক ভারী ব্যাটের সুবিধা তখন ছিল না। আধুনিক ক্রিকেটে দুটি নতুন বল ও ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন বোলারদের যেখানে প্রান্তিক করে দিয়েছে, সেখানে রিভার্স সুইং সামলে হেলমেট ছাড়া বোলারের চোখের দিকে তাকিয়ে শট খেলার সেই যুগ আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে।

৩. জাতীয় রূপকথা: শারজাহ থেকে সিডনির মানসিক শাসন

শচীনের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল রানের অঙ্কে নয়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অবিশ্বাস্য মানসিক শৃঙ্খলায়।

 * শারজাহ ১৯৯৮ (ডেজার্ট স্টর্ম): অস্ট্রেলিয়ার বিধ্বংসী আক্রমণের মুখে মরুঝড়ের রাতে তাঁর খেলা ১৩১ বলে ১৪৩ রানের অতিমানবীয় ইনিংসটি ভারতকে একাই টেনে নিয়ে গিয়েছিল ফাইনালে।

 * সিডনি ২০০৪ (২৪১ রান):* অফ-সাইডে বারবার আউট হওয়ার পর টানা দশ ঘণ্টা ক্রিজে থেকেও পুরো ইনিংসে একটিও কভার ড্রাইভ না খেলে অপরাজিত দ্বিশতক হাঁকানো—ক্রিকেট ইতিহাসে এমন মানসিক আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত বিরল।

আজকের টি-টোয়েন্টি আগ্রাসন ও স্ট্রাইক রেটের চাপে আধুনিক ক্রিকেটে এমন ইনিংস তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।

৪. শচীন বনাম আধুনিক প্রজন্ম: দলীয় শক্তি ও প্রযুক্তির তফাত

আজকের তারকারা পাশে পান শক্তিশালী সাপোর্টিং কাস্ট—রোহিত শর্মা, জসপ্রীত বুমরাহ কিংবা শক্তিশালী মিডল অর্ডার। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় দলের অবস্থা ছিল অনেকটাই এক সদস্যের ওপর নির্ভরশীল।

তাছাড়া আজ ল্যাপটপ আর অ্যানালিস্টদের যুগে প্রতিটি ডেলিভারি মুহূর্তে কাটাছেঁড়া হয়। শচীন দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রতিপক্ষের এমন কাঁটাছেড়ার ঊর্ধ্বে নিজের টেকনিক খালি চোখে অভিযোজিত করেছিলেন। আজকের যুগে একটানা চব্বিশ বছর ধরে ইনজুরির ধকল সামলে, সমস্ত দুর্বলতা আড়াল করে একই ক্ষুধা নিয়ে টিকে থাকা কার্যত অসাধ্য।

৫. আবেগ বনাম বিশুদ্ধ বিনোদন

আজকের ক্রিকেট অনেক বেশি পেশাদার, বর্ণিল এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের কোটি টাকার ছায়ায় মোড়া এক বিশাল বিনোদন শিল্প। কিন্তু শচীন যুগের ক্রিকেট ছিল ব্যক্তিগত আবেগ ও উপাসনা। তিনি যখন ব্যাট করতেন, অফিসে ফাইল আটকে যেত, লোকাল ট্রেন স্টেশনে থেমে যেত, রাজপথ নীরব হয়ে যেত। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের এক যৌথ আবেগের নাম।

ভবিষ্যতে হয়তো শচীনের ১০০ সেঞ্চুরির রেকর্ড ভেঙে আরও বড় কোনো সংখ্যা লেখা হবে স্কোরবোর্ডে। নতুন তারকারা লিখবেন নিজেদের ইতিহাস। কিন্তু প্রতিকূল সময়, বিশ্বের সেরা বোলিং লাইনআপ আর এক বিলিয়ন মানুষের স্বপ্নকে কাঁধে নিয়ে দীর্ঘ ২৪ বছর নিঃশব্দে পথচলার সেই প্রেক্ষাপট আজ আর পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। তাই দ্বিতীয় শচীন টেন্ডুলকার আর কখনোই তৈরি হবে না।

Comments

Popular posts from this blog

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World

মাস্টার ব্লাস্টার: ক্রিকেটের শেষ ব্যাকরণবিদ