অক্টোবর বিপ্লব কেন ‘নভেম্বর বিপ্লব’? ক্যালেন্ডারের গোলকধাঁধা এবং ঐতিহাসিক বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ ইতিবৃত্ত
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যা মানুষের সাধারণ যুক্তিকে থমকে দেয়। রাশিয়ার বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভাসে ‘অক্টোবর বিপ্লব’। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনকারীরা এই বিপ্লবের বর্ষপূর্তি উদযাপন করেন প্রতি বছর ৭ই নভেম্বর।
অক্টোবরের বিপ্লব কীভাবে নভেম্বরের খাতায় নাম লেখাল? এটি কি নিছকই ক্যালেন্ডারের কোনো অদ্ভুত ধাঁধা, নাকি এর পেছনে রয়েছে শত বছরের ক্ষোভ, রক্ত আর অধিকার আদায়ের এক বিশাল সংগ্রাম?
ক্যালেন্ডারের গোলকধাঁধা: জুলিয়ান বনাম গ্রেগরিয়ান
এই ধাঁধার আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে দুটি আলাদা ক্যালেন্ডারের হিসাবে।
১৯১৭ সালে যখন রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ঘটে, তখন রাশিয়ার রাশ ছিল ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’-এর হাতে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জুলিয়াস সিজারের চালু করা এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সৌরবছরের হিসাব ছিল ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে সময় নেয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড বেশি ধরে ফেলা হচ্ছিল।
শুনতে সামান্য মনে হলেও, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অতিরিক্ত সময় জমতে জমতে বিশাল আকার নেয়। এই ত্রুটি সংশোধন করতে ১৫৮২ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি নতুন একটি সৌর পঞ্জিকা চালু করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে। ইউরোপের ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলো ধীরে ধীরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও, রাশিয়ার গোঁড়া অর্থোডক্স চার্চ পোপের এই সংস্কার মানতে অস্বীকার করে। ফলে রাশিয়া পড়ে থাকে পুরোনো জুলিয়ান হিসাবেই।
বিশ শতকে এসে হিসাব করে দেখা যায়, ইউরোপের আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে রাশিয়ার জুলিয়ান ক্যালেন্ডার পাক্কা ১৩ দিন পিছিয়ে রয়েছে!
* রাশিয়ার পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিপ্লবের রাতটি ছিল: ২৪-২৫ অক্টোবর, ১৯১৭।
* কিন্তু ঠিক সেই একই মুহূর্তে বাকি বিশ্ব যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করছিল, তার হিসাবে তারিখটি ছিল: ৬-৭ নভেম্বর, ১৯১৭।
রাশিয়ার কাছে যা ছিল অক্টোবরের শেষ রাত, গোটা বিশ্বের কাছে তা ছিল নভেম্বরের ভোর।
১৯১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভ্লাদিমির লেনিনের সরকার আন্তর্জাতিক স্তরে তাল মেলাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। ১৯১৮ সালের ৩১শে জানুয়ারির পরের দিনটিকে সরাসরি ঘোষণা করা হয় ১৪ই ফেব্রুয়ারি! এক রাতেই রাশিয়ার নাগরিকরা জীবন থেকে ১৩ দিন হারিয়ে ফেলেন। ক্যালেন্ডার সংশোধনের ফলে পুরোনো ২৫শে অক্টোবরের আসল সৌর অবস্থানটি গিয়ে পড়ে ৭ই নভেম্বরের ঘরে। তাই নাম ‘অক্টোবর বিপ্লব’ হলেও এর আনুষ্ঠানিক বর্ষপূর্তি পালিত হয় প্রতি বছর ৭ই নভেম্বর।
বিপ্লবের পটভূমি: ক্ষোভের বহ্নিশিখা জ্বলে ওঠার কারণ
১৯১৭ সালের এই রূপান্তর হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা নিষ্পেষণ:
* স্বৈরতান্ত্রিক জার শাসনের শোষণ: রোমানভ বংশের স্বৈরাচারী জার নিকোলাস (দ্বিতীয়) ও রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণি সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর নির্মম সামাজিক ও রাজনৈতিক অত্যাচার চালাত।
* কৃষকদের চরম দুর্দশা: রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই ছিল ভূমিহীন কৃষক। ১৮৬১ সালে সামন্ততান্ত্রিক ভূমিদাস প্রথা নামেমাত্র উচ্ছেদ হলেও চড়া কর ও ঋণের বোঝায় কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল।
* শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবন: রাশিয়ায় দেরিতে শিল্পায়ন শুরু হলেও কারখানার শ্রমিকদের কাজের সময় ছিল দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা, অথচ মজুরি ছিল নামমাত্র। ট্রেড ইউনিয়ন গড়া কিংবা ধর্মঘট ডাকা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
* প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়ে। প্রায় ১৭ লক্ষ রুশ সৈন্য যুদ্ধে প্রাণ হারায়, দেশজুড়ে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষ অনাহারে মারা যেতে থাকে।
* অস্থায়ী সরকারের ব্যর্থতা: ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে জনগণের অভ্যুত্থানে জারের পতন ঘটলেও ক্ষমতায় আসা আলেকজান্ডার কেরেনস্কির বুর্জোয়া ‘অস্থায়ী সরকার’ যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় এবং জনসাধারণের রুটি ও জমির মৌলিক দাবি পূরণে সম্পূর্ণ অপারগ থাকে।
বিপ্লবের বিস্তার: ‘শান্তি, রুটি ও জমি’
সুইজারল্যান্ড থেকে নির্বাসন শেষে ভ্লাদিমির লেনিন রাশিয়ায় ফিরে এসে তাঁর বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’ ঘোষণা করেন। তাঁর মূল ডাক ছিল: "শান্তি, রুটি ও জমি" (Peace, Bread, Land) এবং "সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতকে দাও" (All Power to the Soviets)।
* রেড গার্ডের প্রস্তুতি: লিওন ট্রটস্কির সামরিক বিপ্লবী কমিটির নেতৃত্বে বলশেভিকপন্থী সশস্ত্র শ্রমিক ও সৈন্যদের নিয়ে ‘রেড গার্ড’ বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
* ক্ষমতা দখল (২৪-২৫ অক্টোবর / ৬-৭ নভেম্বর):
* সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী এক রাতের মধ্যে পেট্রোগ্রাদের প্রধান টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, রেলওয়ে স্টেশন, সেতু এবং স্টেট ব্যাংক দখল করে নেয় বলশেভিকরা।
* ‘অরোরা’ যুদ্ধজাহাজ থেকে নেভা নদীতে তোপ দেগে শীতকালীন প্রাসাদ (Winter Palace) আক্রমণের সংকেত দেওয়া হয়।
* রেড গার্ড বাহিনী শীতকালীন প্রাসাদ ঘেরাও করে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে। কেরেনস্কি শহর ছেড়ে পালিয়ে যান।
* সোভিয়েত সরকারের প্রতিষ্ঠা: দ্বিতীয় নিখিল রুশ সোভিয়েত কংগ্রেসের ঐতিহাসিক বৈঠকে লেনিনের নেতৃত্বে নতুন সমাজতান্ত্রিক সরকার ‘কাউন্সিল অব পিপলস কমিসারস’ গঠিত হয়।
বিপ্লবের প্রকৃতি (Nature)
* সর্বহারা শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ছিল মূলত বুর্জোয়া মধ্যবিত্তদের উত্থান, কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব ছিল মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম শ্রমিক-কৃষক (সর্বহারা) শ্রেণির সফল রাজনৈতিক বিপ্লব।
* পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল অভ্যুত্থান: এটি কোনো অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ছিল না; লেনিন ও ট্রটস্কির নিখুঁত রণকৌশলের ফলে মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো দখল করতে গিয়ে রক্তপাত হয়েছিল যৎসামান্য।
* আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: বলশেভিকরা এই রূপান্তরকে কেবল রাশিয়ার পরিবর্তন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
ফলাফল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব
* বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম: শত শত বছরের রোমানভ রাজবংশ ও বুর্জোয়া আধিপত্য চিরতরে মুছে ফেলে জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি—ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস (USSR)।
* মৌলিক ডিক্রি ও সংস্কার:
* ভূমি ডিক্রি: অভিজাত শ্রেণি ও অর্থোডক্স চার্চের সমস্ত জমি কেড়ে নিয়ে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বণ্টন করা হয়।
* শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয়করণ: সমস্ত ব্যাংক, কলকারখানা, খনি এবং রেলওয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয় এবং কারখানার পরিচালনাভার শ্রমিক কমিটির হাতে অর্পণ করা হয়।
* বিশ্বযুদ্ধ থেকে প্রস্থান: জনগণের শান্তি দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত রাশিয়া জার্মানির সাথে 'ব্রেস্ট-লিটোভস্ক সন্ধি' স্বাক্ষর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ায়।
* উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা: এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলোতে—ভারত, চীন, ভিয়েতনামসহ বহু মুক্তিকামী জাতির জাতীয়তাবাদী ও শ্রমিক আন্দোলনে অক্টোবর বিপ্লবের আদর্শ গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
* সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা: বিনামূল্যে শিক্ষা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সমকাজে সমমজুরি এবং নারীর ভোটাধিকার ও সমান সামাজিক মর্যাদা আইনিভাবে সুরক্ষিত করা হয়।
সময়ের হিসাবে ক্যালেন্ডারের ১৩ দিনের ব্যবধান হয়তো অক্টোবরকে নভেম্বরে টেনে নিয়েছিল, কিন্তু ১৯১৭ সালের সেই রাতের কাঁপন গোটা বিশ্বের সমাজ ও রাজনীতির মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

Comments
Post a Comment