অক্টোবর বিপ্লব কেন ‘নভেম্বর বিপ্লব’ নামে পরিচিত? ক্যালেন্ডারের গোলকধাঁধা
ইতিহাসের পাতায় একটি আশ্চর্য ব্যাপার আছে—একই ঘটনা কখনও কখনও দুটি আলাদা তারিখে পরিচিত হয়। রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে।
‘অক্টোবর বিপ্লব’—কিন্তু ৭ নভেম্বর কেন?
নাম শুনে প্রথমে মনে হতে পারে, ইতিহাসের কোথাও হয়তো ভুল হয়েছে। আসলে ভুল নয়। এর পেছনে রয়েছে দুটি ভিন্ন ক্যালেন্ডারের গল্প—জুলিয়ান ক্যালেন্ডার এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার।
আর এই ১৩ দিনের ব্যবধানই ‘অক্টোবর বিপ্লব’-কে বিশ্বের কাছে ‘নভেম্বর বিপ্লব’-এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।
পুরোনো রাশিয়ার ক্যালেন্ডার ছিল আলাদা
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যে ক্যালেন্ডার চালু ছিল, সেটি ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। ইউরোপের বহু দেশ তার আগেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেছিল।
দুটি ক্যালেন্ডারের মধ্যে তখন পার্থক্য ছিল ১৩ দিন। ফলে রাশিয়ায় যে তারিখ ছিল ২৫ অক্টোবর, পশ্চিম ইউরোপের প্রচলিত ক্যালেন্ডারে সেই একই দিন ছিল ৭ নভেম্বর।
অর্থাৎ—
২৫ অক্টোবর ১৯১৭ (জুলিয়ান ক্যালেন্ডার)
= ৭ নভেম্বর ১৯১৭ (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার)
এই কারণেই বিপ্লবের নামের সঙ্গে ‘অক্টোবর’ এবং ‘নভেম্বর’—দুই মাসের নামই দেখা যায়।
তাহলে বিপ্লবটি আসলে কবে ঘটেছিল?
১৯১৭ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে বলশেভিকরা পেত্রোগ্রাদে ক্ষমতা দখলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। সে সময় রাশিয়ায় প্রচলিত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঘটনাগুলোকে ২৪–২৫ অক্টোবর হিসেবে লেখা হয়েছিল।
কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে সেই দিন ছিল ৬–৭ নভেম্বর।
তাই আজ আমরা যখন ‘অক্টোবর বিপ্লব’ বলি, তখন সেটি মূলত রাশিয়ার তৎকালীন ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুসরণ করে বলা হয়। আর আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত আধুনিক ক্যালেন্ডারে একই ঘটনা নভেম্বরের তারিখে পড়ে।
১৩ দিনের এই পার্থক্য এল কোথা থেকে?
এখানেই ক্যালেন্ডারের আসল রহস্য।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল রোমান শাসক জুলিয়াস সিজারের সময়। পরে পৃথিবীর সৌরবর্ষের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের হিসাবের সামান্য অসামঞ্জস্য জমতে জমতে তারিখের ব্যবধান তৈরি হয়।
১৬ শতকে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশের উদ্যোগে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করা হয়। সময়ের সঙ্গে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করলেও রাশিয়া অনেক পরে পর্যন্ত পুরোনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে যায়।
ফলে ২০ শতকে এসে দুই ক্যালেন্ডারের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় ১৩ দিন।
লেনিন ক্ষমতায় এসে ক্যালেন্ডার বদলালেন কেন?
এখানে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে।
বিপ্লবের পর নতুন বলশেভিক সরকার পুরোনো ক্যালেন্ডার ব্যবস্থাও বদলে দেয়। ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে সরকার পশ্চিম ইউরোপে প্রচলিত গ্রেগরিয়ান পদ্ধতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে ১৯১৮ সালের জানুয়ারি মাসে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে—৩১ জানুয়ারির পরের দিন সরাসরি ১৪ ফেব্রুয়ারি হয়ে যায়। অর্থাৎ মাঝখানের ১৩টি তারিখ ক্যালেন্ডার থেকে বাদ পড়ে যায়।
তবে এটিকে শুধু ‘লেনিনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে। এটি ছিল নতুন সরকারের একটি সরকারি ক্যালেন্ডার সংস্কার, যার উদ্দেশ্যের মধ্যে ইউরোপের প্রচলিত সময়-গণনার সঙ্গে রাশিয়াকে সামঞ্জস্য করা ছিল।
তাহলে ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামটি থেকে গেল কেন?
এটাই সবচেয়ে মজার প্রশ্ন।
ক্যালেন্ডার বদলে গেলেও ইতিহাসের নাম তো রাতারাতি বদলায় না।
১৯১৭ সালের ক্ষমতা দখলের ঘটনাটি রাশিয়ার পুরোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবর বিপ্লব হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে রাশিয়া গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও সেই ঐতিহাসিক নামটি থেকে যায়।
ফলে আজও ইতিহাসের বইয়ে আমরা ‘October Revolution’ বা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামটি দেখি, যদিও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ দিনটি ৭ নভেম্বরের সঙ্গে মিলে যায়।
‘অক্টোবর’ না ‘নভেম্বর’—কোনটি তাহলে ঠিক?
দুটিই ঠিক—শুধু কোন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করছেন, সেটি উল্লেখ করতে হবে।
ক্যালেন্ডার| ঐতিহাসিক তারিখ
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার| ২৪–২৫ অক্টোবর ১৯১৭
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার| ৬–৭ নভেম্বর ১৯১৭
তাই ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামটি এসেছে রাশিয়ার তৎকালীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে। আর আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে সেটি নভেম্বরের ঘটনা।
ইতিহাসের একটি তারিখ কীভাবে বদলে দিতে পারে আমাদের ধারণা
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, বিপ্লব, রাজা বা নেতার গল্প নয়। ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সময়, ক্যালেন্ডার এবং মানুষের তৈরি তারিখের হিসাবও।
একই দিন এক দেশে ২৫ অক্টোবর, অন্য ক্যালেন্ডারে ৭ নভেম্বর হতে পারে। ঘটনা বদলায় না, বদলে যায় তারিখের নাম।
আর সেই ১৩ দিনের ব্যবধানের কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিপ্লব আজও এক অদ্ভুত দ্বৈত পরিচয় বহন করে—
অক্টোবর বিপ্লব, যার আধুনিক ক্যালেন্ডারের তারিখ নভেম্বর।
এই ছোট্ট ক্যালেন্ডারের পার্থক্য না জানলে রুশ বিপ্লবের ইতিহাসের একটি মজার অধ্যায় আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

Comments
Post a Comment