সাম্যবাদের পদধ্বনি: শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের এক বৈপ্লবিক আহ্বান

 

সাম্যবাদের পদধ্বনি: শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের এক বৈপ্লবিক আহ্বান


ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, সভ্যতার অগ্রগতি যতটা না অট্টালিকা নির্মাণের কাহিনী, তার চেয়ে অনেক বেশি শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। মানবসমাজ যখনই ধনসম্পদের পাহাড় আর ক্ষুধার্ত মুখের বৈষম্যে ভাগ হয়েছে, তখনই বাতাস ভারী হয়েছে এক নতুন পরিবর্তনের আশায়। সেই পরিবর্তনের মূলেই রয়েছে সাম্যবাদের মূল সুর—যেখানে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ঘুচিয়ে একটি সমতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখা হয়। আজ একবিংশ শতকের তীব্র পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার মাঝেও দূর থেকে যেন শোনা যায় সেই সাম্যবাদের পদধ্বনি।


সাম্যবাদ কেবল তত্ত্ব নয়, অধিকারের দাবি


কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের হাত ধরে যে দর্শন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপ পেয়েছিল, তার শিকড় আসলে মানুষের মৌলিক চাহিদার ভেতর প্রোথিত। সাম্যবাদ মানে কেবল অর্থনৈতিক সম্পদের সুষম বণ্টন নয়; এর আসল অর্থ হলো মর্যাদার সমতা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার যেন কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির একক সম্পত্তি না হয়, সেই নিশ্চয়তা বিধান করাই এর উদ্দেশ্য।


সভ্যতার ইতিহাস মূলত শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। একদল মানুষ যখন যুগ যুগ ধরে সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে, ঠিক তখনই অন্য প্রান্তের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে বেজে উঠেছে মুক্তির গান। আর এই মুক্তির বার্তা ও অধিকার আদায়ের লড়াইকে রূপক অর্থে বলা হয় 'সাম্যবাদের পদধ্বনি'। সাম্যবাদ বা কমিউনিজম কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, এটি হলো সমাজে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক বৈপ্লবিক চালিকাশক্তি.



সাম্যবাদের আগমন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:-

উনিশ শতকে দার্শনিক কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের লেখনীর মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম এক নতুন সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা পায়. তারা পুঁজিবাদের শৃঙ্খল ভেঙে এমন এক সমাজ গঠনের ডাক দেন, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটবে এবং উৎপাদনের সমস্ত মাধ্যম থাকবে জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণে.


বিশ শতকের শুরুতে বিশ্ব রাজনীতিতে এই পদধ্বনি বাস্তবে রূপ নেয়। ১৯১৭ সালের রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মাও সে তুঙের নেতৃত্বে চীন বিপ্লব প্রমাণ করে যে, সাধারণ মেহনতি মানুষ একজোট হলে শোষকের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব. এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলোই ছিল বিশ্বমঞ্চে সাম্যবাদের বাস্তব পদধ্বনি।


 সাম্যবাদের মূল সুর:-

সাম্যবাদের মূল ভিত্তি হলো সমতা। এর মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা: সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার কৃত্রিম প্রাচীর ভেঙে ফেলা।

২. সম্পদের সুষম বণ্টন: যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করা।

৩. শোষণের অবসান: পুঁজিপতিদের দ্বারা শ্রমিক বা কৃষকদের শ্রমের শোষণ বন্ধ করা।

    


অধিকার আদায়ে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ও গুরুত্ব" :-

বিশ্বের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশেষ করে বাংলার অধিকার আদায়ের ইতিহাসে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অনন্য ও অপরিসীম। সাম্যবাদের তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের অধিকারের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কমিউনিস্ট দল ও তাঁদের কর্মীদের অবদান নিচে আলোচনা করা হলো:


পূর্ণ স্বাধীনতার প্রথম দাবি: -

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯২১ সালের আহমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্টরাই প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার (Complete Independence) দাবি তুলেছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ে তাঁদের ত্যাগ চিরস্মরণীয়।


শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন ও অধিকার রক্ষা:-

 তেভাগা আন্দোলন, তেলেঙ্গানা আন্দোলন থেকে শুরু করে চটকল ও চা-বাগানের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কমিউনিস্টরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ন্যূনতম মজুরি, দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের অধিকার এবং জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমি তুলে দেওয়ার ঐতিহাসিক সংস্কারগুলো কমিউনিস্ট আন্দোলনেরই ফসল।


সামাজিক কল্যাণ ও ধর্মনিরপেক্ষতা:- শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে কমিউনিস্টদের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে তাঁরা সবসময় সোচ্চার থেকেছেন।


বাংলা সাহিত্যে সাম্যবাদের প্রতিধ্বনি:-

বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সাম্যবাদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। শোষিত মানুষের এই জাগরণ কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা আলোড়িত করেছিল কবি-সাহিত্যিকদের মননকেও। সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়ে উঠেছিলেন মানুষের সাম্যের গান। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় বারবার ধ্বনিত হয়েছে বুর্জোয়াদের পতনের বার্তা এবং এক নতুন সাম্যবাদী ভোরের আগমনী গান। বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের এই আহ্বানকেই কবিরা রূপক অর্থে "সাম্যের পদধ্বনি" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় যেমন ধ্বনিত হয়েছিল এক নতুন পৃথিবীর শপথ:


> "এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—

> নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"

> 

এই অঙ্গীকারই সাম্যবাদের মূল আত্মা।"

আধুনিক যুগে সাম্যবাদের প্রাসঙ্গিকতা:-

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ও সম্পদের প্রাচুর্য অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রাচুর্য পৌঁছচ্ছে কার কাছে? বিশ্বজুড়ে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে সিংহভাগ সম্পদ, আর কোটি কোটি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিনের রুটি-রুজির লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে যুদ্ধ—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে সীমাহীন মুনাফালোভী মানসিকতা।


যখন শ্রমের সঠিক মূল্য না পেয়ে কৃষক রাস্তায় নামে, কারখানাগুলোতে কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে, কিংবা সাধারণ যুবসমাজ শিক্ষার অধিকার ও কর্মসংস্থানের দাবিতে সরব হয়—সেখানেই প্রতিধ্বনিত হয় সাম্যবাদের বার্তা। মানুষ যখনই নিজের অধিকার সচেতন হয়ে সমষ্টিগত মুক্তির পথে হাঁটে, তখনই বোঝা যায় সাম্যবাদ কোনো পুরনো ধারণা নয়, বরং আজকের দিনের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।আজকের আধুনিক ও পুঁজিবাদী বিশ্বেও সাম্যবাদের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি। যখনই সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে, যখনই সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখনই অবচেতনভাবেই সাম্যবাদের আদর্শ পুনর্জীবিত হয়ে ওঠে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দূর করার যেকোনো সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনই আসলে সাম্যবাদের সেই চিরন্তন পদধ্বনিরই অংশ।


সামনের পথ:-

সাম্যবাদের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। তবে শোষণহীন এক নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন কখনো স্তব্ধ হতে পারে না। যত দিন সমাজে ধনী ও দরিদ্রের প্রাচীর থাকবে, যত দিন মানুষের শ্রমকে পণ্যের মতো কেনাবেচা করা হবে, তত দিন মানুষের হৃদয়ে সমতার আকাঙ্ক্ষা জ্বলতেই থাকবে। সেই আকাঙ্ক্ষাই যুগে যুগে ইতিহাস গড়েছে, আজও পরিবর্তনকে ডাক দিয়ে আনছে দূর দিগন্ত থেকে।


উপসংহার:-

সাম্যবাদের পদধ্বনি হলো শোষিতের অধিকার সচেতনতার প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং মানবিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন কখনোই ম্লান হতে পারে না। যতদিন সমাজে শোষণ ও অসমতা থাকবে, ততদিন মানুষের মুক্তির এই পদধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে।




Comments

Popular posts from this blog

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World

মাস্টার ব্লাস্টার: ক্রিকেটের শেষ ব্যাকরণবিদ