কর্মক্ষেত্রে মানসিক বা যৌন হেনস্থা? মুখ বুজে নয়—জানুন আপনার আইনি অধিকার
• কর্মক্ষেত্রে মানসিক বা যৌন হেনস্থা? মুখ বুজে নয়—জানুন আপনার আইনি অধিকার
একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ প্রত্যেক কর্মীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে এখনও বহু মানুষ কর্মক্ষেত্রে মানসিক, যৌন বা অন্যান্য ধরনের হয়রানির শিকার হন। আইনি অধিকার এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেকেই নীরবে তা সহ্য করেন।
ভারতে কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ, নিষেধ এবং অভিযোগের প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য Sexual Harassment of Women at Workplace (Prevention, Prohibition and Redressal) Act, 2013, সংক্ষেপে POSH Act, প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০২৬ সালেও সরকারি তথ্য অনুযায়ী POSH Act মূলত কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হেনস্থা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রযোজ্য। তাই “২০২৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে পুরুষ ও রূপান্তরকামী কর্মীরাও POSH Act-এর আওতায় চলে এসেছেন”—এমন দাবি এই লেখায় রাখা হয়নি।
---
কর্মক্ষেত্রে মানসিক ও যৌন হেনস্থা: ভারতীয় আইন কী বলছে?
প্রথমেই বুঝতে হবে—যৌন হেনস্থা এবং অ-যৌন বা মানসিক হেনস্থা সবসময় একই আইনের আওতায় পড়ে না।
১. যৌন হেনস্থা কী?
POSH Act অনুযায়ী, যৌন প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের মধ্যে থাকতে পারে—
- অনিচ্ছাকৃত শারীরিক স্পর্শ বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা;
- যৌন সুবিধা চাওয়া বা দাবি করা;
- যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা;
- অনিচ্ছার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি দেখানো;
- অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৌখিক, শারীরিক বা অ-মৌখিক যৌন আচরণ।
ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী একই আচরণ Bharatiya Nyaya Sanhita, 2023 (BNS)-এর অধীনেও অপরাধ হতে পারে।
বিশেষ করে BNS-এর Section 75-এ যৌন হেনস্থার নির্দিষ্ট কিছু ধরন উল্লেখ করা হয়েছে।
২. মানসিক বা অ-যৌন হেনস্থা
অফিসে অপমান করা, গালিগালাজ, ভয় দেখানো, bullying, অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা, চাকরি বা বেতন নিয়ে হুমকি দেওয়া ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনা সরাসরি POSH Act-এর আওতায় পড়ে না।
ঘটনার ধরন অনুযায়ী এগুলোর ক্ষেত্রে—
- সংস্থার Internal Grievance বা Disciplinary Mechanism;
- Service Rules বা Employment Rules;
- Labour ও Employment Laws;
- Criminal Law;
- অথবা অন্যান্য উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা
গ্রহণ করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, প্রতিটি “mental harassment”-কে POSH offence বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
---
১. POSH Act-এর আওতায় কারা সুরক্ষিত?
POSH Act মূলত নারীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আইনটি বয়স বা চাকরির ধরন নির্বিশেষে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার শিকার নারীদের সুরক্ষার জন্য প্রযোজ্য এবং সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের কর্মক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ রয়েছে।
কর্মক্ষেত্রের সংজ্ঞাটিও বিস্তৃত। চাকরির প্রয়োজনে কর্মী যে জায়গায় যান বা কাজের সঙ্গে যুক্ত যে পরিস্থিতিতে যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটে, সেগুলিও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনের আওতায় আসতে পারে।
---
২. যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কীভাবে অভিযোগ করবেন?
ক) Internal Committee (IC)
যে প্রতিষ্ঠানে ১০ বা তার বেশি কর্মী রয়েছেন, সেখানে POSH Act অনুযায়ী একটি Internal Committee (IC) গঠন করা বাধ্যতামূলক।
এই কমিটি কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট আইনি দায়িত্ব পালন করে।
অভিযোগ করার সময়সীমা
POSH Act-এর Section 9 অনুযায়ী, সাধারণত ঘটনার তারিখ থেকে ৩ মাসের মধ্যে লিখিত অভিযোগ করতে হয়।
যদি একাধিক ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সাধারণত শেষ ঘটনার তারিখ থেকে সময়সীমা গণনা করা হয়।
উপযুক্ত কারণ থাকলে Internal Committee এই সময়সীমা আরও সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
তদন্তের সময়সীমা
POSH Act-এর Section 11 অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা।
তদন্ত চলাকালীন অভিযোগকারী প্রয়োজন অনুযায়ী Interim Relief চাইতে পারেন। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ছুটি বা অন্য জায়গায় বদলির মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
---
৩. Local Committee (LC)
যেসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে ১০ জনের কম কর্মী রয়েছে অথবা অভিযোগটি employer-এর বিরুদ্ধে, সেখানে POSH Act-এর Section 6 অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার Local Committee (LC)-র কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানে Internal Committee না থাকলেও অভিযোগ জানানোর জন্য আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে।
---
৪. SHe-Box: অনলাইনে অভিযোগের ব্যবস্থা
ভারত সরকার কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগের জন্য SHe-Box (Sexual Harassment Electronic Box) নামে একটি অনলাইন ব্যবস্থা চালু করেছে।
২০২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, SHe-Box 2.0-কে একটি প্রযুক্তিনির্ভর single-window platform হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগ নথিভুক্ত এবং তার অগ্রগতি অনুসরণ করা যায়।
তাই যেসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত, সেখানে SHe-Box-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের মাধ্যম হতে পারে।
---
৫. POSH অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের কাছে অভিযোগ করা যাবে কি?
হ্যাঁ—ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী POSH complaint এবং criminal complaint একে অপরকে সবসময় বাদ দেয় না।
কোনো ঘটনা যদি ফৌজদারি অপরাধের উপাদান পূরণ করে, তাহলে পুলিশে অভিযোগ করা যেতে পারে।
BNS-এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা
Section 74
কোনো নারীর শালীনতা লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে assault বা criminal force ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই ধারা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
Section 75 – Sexual Harassment
এই ধারায় যৌন হেনস্থার নির্দিষ্ট কিছু ধরন উল্লেখ রয়েছে, যেমন—
- অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণ;
- যৌন সুবিধা দাবি করা;
- নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে pornography দেখানো;
- sexually coloured remarks ইত্যাদি।
Section 79
কোনো নারীকে অপমান করার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট শব্দ, অঙ্গভঙ্গি বা আচরণের ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
তবে কোন ঘটনায় কোন BNS section প্রযোজ্য হবে তা ঘটনার নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের উপর নির্ভর করে। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে একই ধারা প্রযোজ্য হবে—এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়।
---
৬. পুলিশ FIR নিতে না চাইলে কী করবেন?
ভারতে criminal procedure বর্তমানে Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita, 2023 (BNSS) দ্বারা পরিচালিত হয়, যা ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কার্যকর হয়েছে।
কোনো cognizable offence-এর অভিযোগ যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হলে, পরিস্থিতি অনুযায়ী BNSS-এ নির্ধারিত পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা компетent Magistrate-এর কাছে যাওয়ার আইনি পথও থাকতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উপযোগী।
---
৭. অভিযোগকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু করণীয়
১. প্রমাণ সংরক্ষণ করুন
সম্ভব হলে সংরক্ষণ করুন—
- ই-মেল;
- WhatsApp বা অন্যান্য chat;
- Screenshot;
- ছবি;
- নথিপত্র;
- আইনসম্মতভাবে পাওয়া relevant communication records;
- CCTV-এর তথ্য;
- প্রত্যক্ষদর্শীর নাম ও যোগাযোগের তথ্য।
মূল প্রমাণ অযথা delete বা পরিবর্তন করবেন না।
২. ঘটনার লিখিত রেকর্ড রাখুন
প্রতিটি ঘটনার একটি chronological record তৈরি করুন।
লিখে রাখুন—
- ঘটনার তারিখ;
- সময়;
- স্থান;
- কী বলা বা করা হয়েছিল;
- কারা উপস্থিত ছিলেন;
- ঘটনার পরে কী যোগাযোগ হয়েছিল;
- আপনি কাকে বা কোথায় অভিযোগ করেছিলেন।
৩. গোপনীয়তা বজায় রাখুন
POSH Act-এর Section 16 অনুযায়ী অভিযোগ, তদন্তের বিষয়বস্তু এবং অভিযোগকারী, অভিযুক্ত ও সাক্ষীদের পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের উপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে।
তাই POSH complaint-এর বিস্তারিত তথ্য সামাজিক মাধ্যমে বা জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
৪. Interim Relief চাইতে পারেন
তদন্ত চলাকালীন নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে POSH Act-এর Section 12 অনুযায়ী উপযুক্ত interim relief চাওয়া যেতে পারে।
৫. প্রতিশোধমূলক আচরণের রেকর্ড রাখুন
অভিযোগ করার পরে যদি হুমকি, চাপ, প্রতিশোধমূলক আচরণ, চাকরির ক্ষেত্রে অন্যায় চাপ বা অন্য কোনো adverse treatment দেখা যায়, তাহলে তারও লিখিত রেকর্ড রাখুন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানান।
---
৮. নিয়োগকর্তার দায়িত্ব কী?
POSH Act অনুযায়ী নিয়োগকর্তারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা;
- যেখানে প্রয়োজন সেখানে Internal Committee গঠন করা;
- Committee-কে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া;
- তদন্তে সহযোগিতা করা;
- কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা;
- কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা সংক্রান্ত তথ্য এবং Internal Committee-এর বিবরণ প্রদর্শন করা;
- প্রয়োজন হলে অভিযোগকারীকে criminal complaint করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা।
এসব দায়িত্ব POSH Act-এর Section 19-সহ বিভিন্ন বিধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
---
৯. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় হেল্পলাইন
১১২ – Emergency Response Support System
112 ভারতের unified emergency response number। তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে পুলিশ, চিকিৎসা বা অন্যান্য জরুরি সহায়তার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
১৮১ – Women Helpline
181 নারী সহায়তা পরিষেবার জন্য ব্যবহৃত সরকারি Women Helpline।
৭৮২৭১৭০১৭০ – National Commission for Women
National Commission for Women (NCW)-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী 7827170170 নম্বরটি 24×7 Women Helpline হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ: পুরনো বা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া নম্বরের উপর নির্ভর না করে NCW-এর বর্তমান official information থেকে নম্বর যাচাই করে নেওয়া উচিত।
---
১০. পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ হেল্পলাইন
১০৯১ – Women Help Line
West Bengal Police-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী 1091 Women Help Line হিসেবে তালিকাভুক্ত।
১০০ – Police Control Room
জরুরি পুলিশ সহায়তার জন্য 100 নম্বরটি West Bengal Police-এর তালিকাভুক্ত Police Control Room number।
১০৯৮ – Child Help Line
কোনো শিশু নির্যাতন, বিপদ বা জরুরি পরিস্থিতির শিকার হলে 1098 Child Help Line ব্যবহার করা যেতে পারে।
West Bengal Commission for Women
West Bengal Commission for Women-এর বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী যোগাযোগের নম্বরগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- 033-2359-5609
- 033-2334-5324
- 033-2321-0154
কমিশনের মাধ্যমে অভিযোগ ও Pre-Litigation Counselling-এর ব্যবস্থাও রয়েছে।
নোট: সরকারি হেল্পলাইন ও যোগাযোগের তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই জরুরি পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারি website থেকে নম্বর যাচাই করে নেওয়া ভালো।
---
১১. ভারতের সংবিধান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষা
ভারতের সংবিধানে সরাসরি “POSH Act” নামটি উল্লেখ নেই। তবে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে সুরক্ষার সাংবিধানিক ভিত্তির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার ও সাংবিধানিক নীতির সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক Vishaka v. State of Rajasthan মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছিল।
Article 14 – সমতার অধিকার
Article 14 আইনের চোখে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার কথা বলে।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা সমতা ও সমান আচরণের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
Article 15 – বৈষম্য নিষিদ্ধ
Article 15 রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। এর মধ্যে sex বা লিঙ্গও রয়েছে।
Article 15(3) রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি দেয়।
Article 19(1)(g) – পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা
Article 19(1)(g) নাগরিকদের পেশা বা occupation পরিচালনার স্বাধীনতা প্রদান করে, সাংবিধানিকভাবে অনুমোদিত সীমাবদ্ধতার অধীন।
নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশের সঙ্গে এই সাংবিধানিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
Article 21 – জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার
Article 21 জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা প্রদান করে।
সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যায় dignity বা মর্যাদার সঙ্গে জীবনধারণের অধিকারকে যুক্ত করা হয়েছে।
Vishaka মামলায় কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থাকে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।
Article 42 – ন্যায়সংগত ও মানবিক কর্মপরিবেশ
Article 42 সংবিধানের Directive Principles of State Policy-এর অংশ।
এতে রাষ্ট্রকে ন্যায়সংগত ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
---
১২. Vishaka Guidelines-এর ঐতিহাসিক পটভূমি
ভারতে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার ইতিহাসে Vishaka v. State of Rajasthan (1997) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলা।
এই মামলার পটভূমিতে ছিলেন রাজস্থানের সমাজকর্মী Bhanwari Devi, যিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের কাজে যুক্ত ছিলেন এবং সেই দায়িত্ব পালনের সময় ভয়াবহ যৌন সহিংসতার শিকার হন।
ঘটনার পর Vishaka-সহ কয়েকটি নারী অধিকার সংগঠন সুপ্রিম কোর্টে Public Interest Litigation (PIL) দায়ের করে।
সেই সময়ে ভারতে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা মোকাবিলার জন্য আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন ছিল না।
১৯৯৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক Vishaka Guidelines জারি করে। আদালত কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থাকে নারীর সাংবিধানিক অধিকার—বিশেষত Article 14, 15, 19 এবং 21-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে।
পরবর্তীতে সংসদ 2013 সালে POSH Act প্রণয়ন করে।
---
১৩. কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার অভিযোগের নমুনা চিঠি
Internal Committee বা Local Committee-র কাছে অভিযোগ করার সময় চিঠিটি পরিষ্কার, সংক্ষিপ্ত এবং তথ্যভিত্তিক হওয়া উচিত।
প্রতি,
Presiding Officer / Chairperson
Internal Committee (IC)
[কোম্পানি/প্রতিষ্ঠানের নাম]
[ঠিকানা]
বিষয়: কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
মহাশয়া/মহাশয়,
আমি [আপনার পুরো নাম], [প্রতিষ্ঠানের নাম]-এ [আপনার পদবী] হিসেবে কর্মরত। আমার Employee ID [যদি থাকে]।
আমি কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত যৌন হেনস্থার কয়েকটি ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানাচ্ছি।
ঘটনার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. অভিযুক্ত ব্যক্তির বিবরণ
[নাম, পদবী, বিভাগ—যদি জানা থাকে]
২. ঘটনার বিবরণ
[ঠিক কী ঘটেছিল তা পরিষ্কারভাবে লিখুন। যেমন—অনিচ্ছাকৃত শারীরিক স্পর্শ, যৌন মন্তব্য, কুপ্রস্তাব, অশালীন message বা অন্য কোনো আচরণ।]
৩. তারিখ, সময় ও স্থান
ঘটনাটি [তারিখ/তারিখসমূহ], আনুমানিক [সময়], [অফিস/কেবিন/মিটিং/অনলাইন platform]-এ ঘটেছে।
৪. প্রমাণ
প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আমি নিম্নলিখিত প্রমাণ সংরক্ষণ/সংযুক্ত করছি:
- Email-এর copy;
- Chat screenshot;
- Relevant documents;
- CCTV footage সংরক্ষণের অনুরোধ;
- অন্যান্য supporting material।
৫. সাক্ষী
[যদি কেউ ঘটনাটি দেখে থাকেন, তাঁর নাম ও পরিচয়]
এই ঘটনাগুলির ফলে আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি এবং এর প্রভাব আমার কাজের উপরও পড়ছে।
অতএব, POSH Act, 2013 এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী আমার অভিযোগটি গ্রহণ করে একটি নিরপেক্ষ ও যথাযথ তদন্ত শুরু করার জন্য অনুরোধ করছি।
তদন্ত চলাকালীন আমার নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় interim relief দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করার অনুরোধ করছি।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করতে আমি প্রস্তুত।
ধন্যবাদান্তে,
আপনার বিশ্বস্ত,
[স্বাক্ষর]
[পুরো নাম]
[পদবী]
[Employee ID]
[ফোন নম্বর]
[ই-মেল]
তারিখ: [তারিখ]
স্থান: [শহর]
---
উপসংহার
কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা এমন কোনো বিষয় নয় যা একজন কর্মীকে নীরবে সহ্য করতেই হবে।
ভারতে POSH Act নারীদের কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রতিকারের একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রদান করে। ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী BNS, employment rules, labour laws এবং অন্যান্য আইনি ব্যবস্থাও প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই—
ঘটনার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
সময়মতো অভিযোগ করুন।
প্রয়োজনে interim protection চান।
সঠিক আইনি ফোরামে যোগাযোগ করুন।
এবং প্রয়োজন হলে যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
নিজের অধিকার সম্পর্কে জানুন। সচেতন থাকুন। নিরাপদ থাকুন।
---
আইনি সতর্কীকরণ
এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ সচেতনতা ও তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শের বিকল্প নয়।
কোন আইন বা কোন ধারা প্রযোজ্য হবে তা প্রতিটি ঘটনার তথ্য, পরিস্থিতি এবং প্রমাণের উপর নির্ভর করে। আইন, সরকারি portal, helpline এবং প্রশাসনিক পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় যোগ্য আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া এবং বর্তমান সরকারি তথ্য যাচাই করা উচিত।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক বা যৌন হেনস্থা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে নিচে প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর (Q&A) দেওয়া হলো, যা আপনাকে আপনার আইনি অধিকার বুঝতে সাহায্য করবে:
## ১. কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা (Sexual Harassment) বলতে ঠিক কী বোঝায়?
উত্তর: কাজের জায়গায় কোনো কর্মীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে করা যেকোনো ধরনের যৌন ইঙ্গিতবাহী আচরণই হলো যৌন হেনস্থা। এর মধ্যে রয়েছে:
* শারীরিক স্পর্শ বা জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।
* যৌন অনুগ্রহ বা সুবিধা পাওয়ার দাবি বা অনুরোধ।
* যৌন উস্কানিমূলক বা আপত্তিকর মন্তব্য করা।
* পর্নোগ্রাফি বা কোনো অশোভন ছবি/ভিডিও দেখানো।
* কোনো ধরনের যৌন ইঙ্গিতবাহী শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ।
## ২. ভারতের আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কী সুরক্ষা রয়েছে?
উত্তর: ভারতে POSH Act, 2013 (Prevention, Prohibition and Redressal of Sexual Harassment) বা "কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকার আইন" রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, ১০ জন বা তার বেশি কর্মী আছেন এমন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি বা Internal Complaints Committee (ICC) থাকা বাধ্যতামূলক, যা এই সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত করে।
## ৩. কর্মক্ষেত্রে মানসিক হেনস্থা (Mental Harassment/Bullying) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মানসিক হেনস্থা বা বুলিং হলো কোনো কর্মীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানসিকভাবে নির্যাতন করা। যেমন:
* সবার সামনে বারবার অপমান বা কটূক্তি করা।
* ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যায়ভাবে চাকরি কেড়ে নেওয়ার বা ক্যারিয়ার নষ্ট করার হুমকি দেওয়া।
* কোনো কারণ ছাড়াই সবসময় টার্গেট করা এবং একঘরে (Isolate) করে দেওয়া।
* বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ বা শারীরিক গঠন নিয়ে ক্রমাগত উপহাস করা।
## ৪. হেনস্থার শিকার হলে একজন কর্মীর প্রথম করণীয় কী?
উত্তর: মুখ বুজে না থেকে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
* প্রতিবাদ করুন: সম্ভব হলে শুরুতেই স্পষ্টভাবে হেনস্থাকারীকে জানিয়ে দিন যে তার আচরণ আপত্তিকর।
* প্রমাণ সংগ্রহ করুন: হেনস্থার তারিখ, সময়, ঘটনার বিবরণ এবং কোনো সাক্ষী থাকলে তার নাম লিখে রাখুন। কোনো আপত্তিকর ইমেল, চ্যাট বা মেসেজ থাকলে তার স্ক্রিনশট বা প্রিন্টআউট নিজের কাছে সুরক্ষিত রাখুন।
* লিখিত অভিযোগ: আপনার প্রতিষ্ঠানের ICC (যৌন হেনস্থার ক্ষেত্রে) বা HR/উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানান।
## ৫. কোম্পানি যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয় বা ICC না থাকে, তবে কোথায় অভিযোগ করা যাবে?
উত্তর: কোম্পানি ব্যবস্থা না নিলে বা ছোট প্রতিষ্ঠান (যেখানে কর্মী ১০ জনের কম) হলে আপনি নিচের মাধ্যমগুলোতে সাহায্য পেতে পারেন:
* Local Complaints Committee (LCC): প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে একটি স্থানীয় কমিটি থাকে, সেখানে অভিযোগ জানানো যায়।
* SHe-Box: ভারত সরকারের মহিলা ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের একটি অনলাইন পোর্টাল রয়েছে (SHe-Box - Sexual Harassment electronic Box), যেখানে সরাসরি অনলাইনে অভিযোগ নথিভুক্ত করা যায়।
* পুলিশ প্রশাসন: হেনস্থার ঘটনাটি গুরুতর হলে বা ভারতীয় দণ্ডবিধি (বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS) অনুযায়ী অপরাধ হলে সরাসরি থানায় FIR দায়ের করা যেতে পারে।
## ৬. অভিযোগ জানালে কি চাকরি চলে যাওয়ার ভয় থাকে? আইন এ বিষয়ে কী বলে?
উত্তর: আইন অনুযায়ী, অভিযোগকারী বা সাক্ষীদের ওপর কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা (Retaliation) নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। তদন্ত চলাকালীন অভিযোগকারী চাইলে সাময়িক বদলি বা ছুটির আবেদন করতে পারেন, যাতে তাকে হেনস্থাকারীর অধীনে বা সামনে কাজ করতে না হয়।

Comments
Post a Comment