ফেসবুকে যে শাড়ির মডেলদের দেখছেন, তারা কি আদৌ আসল মানুষ? জানুন AI মডেল তৈরির পেছনের রহস্য!
ফেসবুকে যে শাড়ির মডেলদের দেখছেন, তারা কি আদৌ আসল মানুষ? জানুন AI মডেল তৈরির পেছনের রহস্য!
আজকাল ফেসবুক স্ক্রল করলেই চমৎকার সব শাড়ির বিজ্ঞাপন আমাদের চোখে পড়ে। লাল পেড়ে শাড়ি, কপালে ছোট টিপ আর মিষ্টি হাসির কোনো এক বাঙালি তরুণী হয়তো সেই বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকেই ভাবেন এটি হয়তো নতুন কোনো মডেল বা সাধারণ কোনো মেয়ের ছবি।
কিন্তু আপনি কি জানেন, বর্তমানে ইন্টারনেটে দেখা এই ধরনের অনেক মডেলের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই? হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! তারা কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নন, বরং কম্পিউটারের ভেতর তৈরি করা এক একটি AI Generated Virtual Influencer (এআই চালিত কৃত্রিম মডেল)।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের দুনিয়ায় মডেলিংয়ের খরচ বাঁচাতে ও নিখুঁত কাজ পেতে আজকাল এই প্রযুক্তি দেদারসে ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা এই প্রযুক্তির ব্যাপারে একদম নতুন, তাদের জন্য আজ খুব সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে পর্দাফাঁস করব কীভাবে এই অবাস্তব মডেলগুলো তৈরি করা হয়।
ধাপ ১: কাল্পনিক চরিত্রের রূপরেখা তৈরি
সবচেয়ে প্রথমে গ্রাফিক ডিজাইনার বা মার্কেটাররা কম্পিউটারে বসে একটি পরিকল্পনা করেন। তারা ঠিক করেন যে মডেলটিকে দেখতে কেমন লাগবে—তার বয়স কত হবে, গায়ের রঙ কেমন হবে, কিংবা তাকে ভারতীয় বা বাঙালি নারীর রূপ দেওয়া হবে কি না। এই পুরো ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই তার একটি সুন্দর কাল্পনিক নাম ও প্রোফাইল ঠিক করা হয়।
ধাপ ২: টেক্সট থেকে অবাস্তব চেহারা তৈরি (Text-to-Image AI)
মডেলের রূপরেখা ঠিক করার পর সাহায্য নেওয়া হয় শক্তিশালী কিছু AI টুলের (যেমন: Midjourney, Stable Diffusion বা DALL-E) [১]। ডিজাইনাররা এইツールগুলোতে গিয়ে শুধু লিখে দেন (যাকে বলা হয় Prompt):
"একটি ২০ বছর বয়সী সুন্দরী বাঙালি মেয়ে, যে ঐতিহ্যবাহী লাল শাড়ি পরে হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।"
ব্যাস! এই সামান্য নির্দেশ পেয়েই এআই তার মেমোরিতে থাকা কোটি কোটি ছবি বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি নিখুঁত চেহারা তৈরি করে দেয় [১]। এই চেহারার সাথে পৃথিবীর কোনো বাস্তব মানুষের মিল থাকে না।
ধাপ ৩: আসল শাড়ির সাথে মুখ জুড়ে দেওয়া (Face Swapping)
যেহেতু এটি শাড়ির বিজ্ঞাপন, তাই ক্রেতাদের আসল শাড়িটিই দেখাতে হবে। এর জন্য বিক্রেতারা প্রথমে কোনো ডামি বা সাধারণ মানুষের গায়ে আসল শাড়িটি পরিয়ে ছবি তোলেন। এরপর InsightFace বা এই ধরনের ফেস-সোয়াপ এআই প্রযুক্তির সাহায্যে সেই ছবির মুখের জায়গায় এআই-এর তৈরি কৃত্রিম মুখটি নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মনে হয়, ওই কৃত্রিম মডেলটিই আসল শাড়িটি পরে আছেন!
ধাপ ৪: ভিডিও ও কণ্ঠের জাদুকরী মিশ্রণ (AI Video & Voice)
বিজ্ঞাপনে যদি সেই মডেলকে কথা বলতে বা নড়াচড়া করতে দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ভিডিও মেকিং এআই (যেমন: HeyGen বা Synthesia)।
প্রথমে একটি বাংলা স্ক্রিপ্ট লিখে দেওয়া হয়। এরপর একটি এআই ভয়েস (কৃত্রিম কণ্ঠ) নির্বাচন করা হয় যা শুনতে একদম আসল মানুষের মতো লাগে। সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মডেলের ঠোঁটের নড়াচড়া (Lip-sync) এবং চোখের পলক ফেলার ভঙ্গি এমনভাবে মিলিয়ে দেয় যেন মনে হবে সত্যি কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বলছে।
ধাপ ৫: ফেসবুক পেজ ও মার্কেটিং
সবশেষে, এই এআই মডেলের নামে একটি ফেসবুক পেজ খোলা হয়। বিজ্ঞাপনের সুন্দর সুন্দর বাংলা ক্যাপশন লেখার কাজটাও করা হয় ChatGPT-এর মতো টেক্সট জেনারেটর এআই দিয়ে। এরপর ফেসবুকে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন (Boost) করে সাধারণ মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে দেওয়া হয়।
** ক্রেতা হিসেবে আপনার যা জানা জরুরি (সতর্কবার্তা)
কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও আছে। অনেক সময় প্রতারক চক্র এই ধরনের এআই মডেল ব্যবহার করে ভুয়া পেজ খোলে। তারা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে নেয়, কিন্তু পরে আর পণ্য ডেলিভারি দেয় না।
তাই ফেসবুকে এই ধরনের এআই মডেলের বিজ্ঞাপন দেখে কেনাকাটা করার আগে পেজটি আসল কি না, রিভিও কেমন এবং ক্যাশ অন ডেলিভারি (হাতে পেয়ে টাকা দেওয়া) সুবিধা আছে কি না, তা অবশ্যই ভালো করে যাচাই করে নেবেন।
💡 ফেসবুকের বিজ্ঞাপনে আসল মানুষ আর AI মডেল চিনবেন কীভাবে? (৫টি সহজ উপায়)
এআই প্রযুক্তির ছবিগুলো দেখতে এতটাই নিখুঁত হয় যে প্রথম পলকে চেনা মুশকিল। তবে একটু ভালো করে লক্ষ করলে আপনি নিজেই ধরে ফেলতে পারবেন ছবিটি আসল মানুষের নাকি এআই-এর তৈরি:
• আঙুল ও হাতের গড়ন লক্ষ করুন: AI প্রযুক্তি এখনও মানুষের হাত এবং আঙুল নিখুঁতভাবে তৈরি করতে হিমশিম খায়। ছবির মডেলের হাত বা আঙুলের দিকে তাকান—দেখবেন আঙুল ৫টার কম-বেশি আছে, কিংবা হাতটি দেখতে কেমন যেন অদ্ভুত বা বাঁকা লাগছে।
• কানের দুল ও গহনার অমিল: মডেল যদি কানের দুল বা গলার হার পরে থাকেন, তবে দুই কানের দুলের ডিজাইন ভালো করে মিলিয়ে দেখুন। AI সাধারণত দুই কানের দুল হুবহু একরকম বানাতে পারে না, একটু না একটু অমিল বা ঝাপসা ভাব থেকেই যায়।
• অস্বাভাবিক নিখুঁত ত্বক ও প্লাস্টিক ভাব: AI মডেলদের ত্বক সাধারণত অতিরিক্ত মসৃণ এবং নিখুঁত হয়। মানুষের ত্বকে যে স্বাভাবিক টেক্সচার, তিল, বা সূক্ষ্ম ভাঁজ থাকে, তা এআই ছবিতে থাকে না। দেখতে অনেকটা প্লাস্টিকের পুতুলের মতো মনে হয়।
• চোখের মণি ও দৃষ্টির শূন্যতা: ছবির মডেলের চোখের দিকে তাকান। এআই-এর তৈরি মডেলদের চোখের মণি অনেক সময় পুরোপুরি গোল হয় না এবং তাদের দৃষ্টির মধ্যে এক ধরণের শূন্যতা বা প্রাণহীন ভাব থাকে, যা আসল মানুষের চোখে থাকে না।
• ব্যাকগ্রাউন্ডের অস্পষ্টতা: মডেলের পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড বাbackground অবজেক্টগুলোর দিকে খেয়াল করুন। AI ছবিতে পেছনের জিনিসপত্র, গাছপালা বা আসবাবপত্র অনেক সময় অদ্ভুতভাবে বেঁকে থাকে বা ঝাপসা (Blurry) দেখায়।


















Comments
Post a Comment