কুমোরটুলির অন্দরে ২০২৬: এআই দুর্গা থেকে কাঁচামালের সংকট, কেমন কাটছে মৃৎশিল্পীদের দিন?

 


কুমোরটুলির অন্দরে ২০২৬: এআই দুর্গা থেকে কাঁচামালের সংকট, কেমন কাটছে মৃৎশিল্পীদের দিন?

শরতের মেঘলা আকাশ, বাতাসে শিউলির গন্ধ আর কাশের দোলা জানান দেয় মা আসছেন। তবে এই চেনা গন্ধের ভিড়ে উত্তর কলকাতার গঙ্গার তীরবর্তী কুমোরটুলির অলিগলিতে কান পাতলে এখন শোনা যায় এক ভিন্ন সুর। সেখানে একদিকে যেমন চলছে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার টানাপোড়েন, তেমনই আরেকদিকে রয়েছে জীবিকার চেনা লড়াই।

২০২৬-এর দুর্গাপুজোয় কুমোরটুলির চালচিত্র এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে অ্যালগরিদমের ডিজিটাল নিখুঁত নকশা, অন্যদিকে শিল্পীর কাদামাখা আঙুলের ছোঁয়া। কেমন কাটছে এবার মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ত দিনগুলি?

এআই দুর্গা বনাম সাবেকি ছাঁচ: নতুন ট্রেন্ডের মুখোমুখি কুমোরটুলি

এ বছরের পুজোয় শহরজুড়ে অন্যতম বড় চর্চার বিষয় ‘এআই দুর্গা’ (AI Durga)। বেশ কিছু পুজো কমিটি মণ্ডপসজ্জা থেকে শুরু করে প্রতিমার রূপরেখা তৈরিতে সাহায্য নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোয় তৈরি হচ্ছে অচেনা রঙের বিন্যাস, পরাবাস্তব অবয়ব এবং জটিল জ্যামিতিক নকশা। উদ্যোক্তারা সেই ডিজিটাল কনসেপ্ট প্রিন্ট করে বা ফোনে নিয়ে ছুটছেন কুমোরটুলির স্টুডিওগুলোতে—"দাদা, ঠিক এইরকম নিখুঁত একটা প্রতিমা নামিয়ে দিতে হবে।"

তবে মজার বিষয় হলো, এআই-এর এই ডিজিটাল ঝড়ের উল্টো স্রোতও কিন্তু বেশ জোরালো। অতি-আধুনিকতার ভিড়ে বহু বনেদি ও বারোয়ারি পুজো এবার ফিরে যাচ্ছে শিকড়ে। ডাকের সাজ, একচালা আর সাবেক বাংলা মুখের প্রতিমার চাহিদা এ বছর চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বহু দর্শনার্থী ও উদ্যোক্তা মনে করছেন, স্ক্রিনের পিক্সেল হয়তো নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, কিন্তু একচালার দুর্গার চোখের সেই বাৎসল্য আর মাতৃরূপ কেবল শিল্পীর তুলির টানেই জীবন্ত হয়ে ওঠে।

কাঁচামালের সংকট: বাংলাদেশ থেকে পাট না আসার ধাক্কা

ট্রেন্ডের চর্চা বাইরে যতই থাকুক, শিল্পীদের ঘরের ভেতরের বাস্তবতাটা বেশ কঠিন। প্রতিমা তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ হলো ভালো মানের পাট ও খড়, যা কাঠামোর বাঁধুনি ও মাটির স্থায়িত্বের জন্য অপরিহার্য। ঐতিহ্যগতভাবেই উন্নতমানের মোলায়েম ও শক্ত পাটের একটি বড় অংশ আসত বাংলাদেশ থেকে।

তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জটিলতার জেরে এ বছর বাংলাদেশ থেকে পাটের জোগান কার্যত বন্ধ বা ভীষণভাবে সীমিত। ফলে:

 * বিকল্প পাটের চড়া দাম: স্থানীয় বাজার থেকে যে পাট মিলছে, তার দাম গত বছরের তুলনায় অনেকটা বেশি।

 * উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: শুধু পাট নয়, বাঁশ, খড়, মাটি থেকে শুরু করে রঙের দামও একলাফে বেড়েছে।

 * বাজেটের টানাপোড়েন: বাজেট আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচের বোঝা অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পীদের নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হচ্ছে। পুজো কমিটিগুলোর বাজেট নির্দিষ্ট থাকায় সেই বাড়তি খরচের পুরোটা তাদের থেকে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আঙুলের জাদুতে অ্যালগরিদমের জবাব

কুমারটুলির প্রবীণ মৃৎশিল্পীদের চোখে এআই কোনো ভয়ের কারণ নয়, বরং এক নতুন কৌতূহল। এক শিল্পীর কথায়, "কম্পিউটার হয়তো প্রতিমার একটা অসম্ভব সুন্দর রূপ ভেবে দিতে পারে, কিন্তু গঙ্গামাটির সাথে তুষ আর পাট মিশিয়ে সেই কাঠামোয় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার কাজটা কোনো সফটওয়্যার করতে পারবে না। মাটি কখন জল টানবে আর তুলির শেষ টানটা কোথায় থামবে, সেটা শুধু হাতই জানে।"

কাঁচামালের অভাব আর চড়া বাজারদরের সঙ্গে যুঝতে যুঝতেই দিন-রাত এক করে কাজ করছেন শিল্পীরা। উনুনের আঁচে ভেজা মাটি শুকানো হচ্ছে, রাত জেগে চলছে চক্ষুদান।

২০২৬-এর কুমোরটুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই এগোবে, মানুষের হাতের ছোঁয়ার মূল্য ততই বাড়বে। এআই দুর্গার চোখ ধাঁধানো কল্পনা আর সাবেক প্রতিমার মায়াবী রূপ—দুটোকেই আপন দক্ষতায় গড়ে তুলছেন এই মাটির কারিগররা। কাঁচামালের সংকট ও খরচের হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হচ্ছে সেই শিল্পীরই, যাঁর স্পর্শে সামান্য খড়-মাটি রূপ নেয় দশভুজা মহামায়ায়।

Comments

Popular posts from this blog

Artificial Intelligence (AI) and World Politics: How is AI changing power in war or diplomacy?

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World