মমতা কি ফিরবেন পুরনো ঘরে? অধীর চৌধুরীর কংগ্রেস বার্তার নেপথ্য সমীকরণ

 

মমতা কি ফিরবেন পুরনো ঘরে? অধীর চৌধুরীর কংগ্রেস বার্তার নেপথ্য সমীকরণ 


২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় পরাজয়ের পর বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এখন এক গভীর সাংগঠনিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ রদবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই টালমাটাল পরিস্থিতির মাঝেই বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন ঘৃতাহুতি দিলেন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুনরায় কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার এবং তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার জন্য অধীর চৌধুরীর এই সাম্প্রতিক আহ্বান রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে।


স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সত্যিই তাঁর পুরনো দল কংগ্রেসে ফিরে যাবেন? নাকি এই বার্তার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো গভীর রাজনৈতিক চাল?


১. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: ভাঙন থেকে মিলনের প্রস্তাব


১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করেছিলেন 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস'। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি বাংলার ক্ষমতায় বসেন। আজ প্রায় তিন দশক পর, তৃণমূল যখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে জর্জরিত, তখন কংগ্রেসের তরফ থেকে তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মোড়।


২. অধীর চৌধুরীর বার্তার নেপথ্যের আসল রাজনীতি কী?


চিরকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত অধীর রঞ্জন চৌধুরীর এই নরম সুর বা প্রস্তাবের পেছনে বেশ কয়েকটি কৌশলগত কারণ থাকতে পারে:


• বিজেপি বিরোধী ভোটব্যাংক একত্রীকরণ: ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর বিরোধী শিবিরের প্রধান শক্তি হিসেবে যারা উঠে এসেছে, তাদের রুখতে ধর্মনিরপেক্ষ ও মোদী-বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়, সেটাই কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য।


• দিল্লির রাজনীতি ও ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের সমীকরণ: জাতীয় স্তরে বিজেপিকে মোকাবিলা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমাকে ব্যবহার করতে চায় কংগ্রেস হাইকম্যান্ড। মমতা কংগ্রেসে ফিরলে জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের হাত আরও শক্ত হবে।


• তৃণমূলের শূন্যস্থান পূরণ: তৃণমূলের অন্দরে যে সংকট চলছে, তার সুযোগ নিয়ে বাংলায় কংগ্রেসের হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করা এবং নিচু তলার কর্মীদের নিজেদের ছাতার তলায় নিয়ে আসা।


৩. মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি কংগ্রেসে ফিরবেন?


এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা সহজ নয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেসে ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, তা বেশ কিছু কঠিন শর্তের ওপর নির্ভর করছে:


• নেতৃত্বের প্রশ্ন: অধীর চৌধুরী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার কথা বললেও, দিল্লির হাইকম্যান্ড (রাহুল গান্ধী বা মল্লিকার্জুন খাড়গে) সর্বভারতীয় স্তরে মমতাকে কতটা জায়গা ছাড়বে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।


• তৃণমূলের ভবিষ্যৎ: নিজের হাতে তৈরি দল 'তৃণমূল কংগ্রেস'-কে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিয়ে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেবেন, নাকি তৃণমূলকে কংগ্রেসের সাথে মিশিয়ে (Merge) দেবেন—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।


• অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান: তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদলের মাঝে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে।


৪. বাংলার রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব

যদি এই রাজনৈতিক পুনর্বাসন সত্যি হয়, তবে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ দেখা যাবে:


১. এক বনাম এক লড়াই: একদিকে থাকবে শক্তিশালী বিজেপি বা বিরোধী পক্ষ, অন্যদিকে থাকবে কংগ্রেস-তৃণমূলের যৌথ শক্তি।


২. তৃণমূল কর্মীদের ভবিষ্যৎ: দলের নিচু তলার কর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে নেন, তার ওপর নির্ভর করবে দলের একাংশ অন্য কোনো শিবিরে যোগ দেবে কি না।

                       


উপসংহার

রাজনীতিতে কোনো কিছুই অসম্ভব নয় এবং এখানে কোনো স্থায়ী শত্রু বা মিত্র থাকে না। ২০২৬-এর নির্বাচনী বিপর্যয় তৃণমূল কংগ্রেসকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অধীর চৌধুরীর বার্তাটি কেবল একটি সৌজন্য প্রস্তাব নয়, বরং এটি আগামী দিনের এক বড় রাজনৈতিক চাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তার ওপরেই নির্ভর করছে বাংলার এবং আগামী দিনে দিল্লির রাজনীতির ভাগ্য।


 ব্লগের পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন ----

"আপনার কি মনে হয় মমতার কংগ্রেসে ফেরা উচিত? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট করে

Comments

Popular posts from this blog

Artificial Intelligence (AI) and World Politics: How is AI changing power in war or diplomacy?

Beware of Cybercrime: 7 Easy Ways to Stay Safe on the Internet

Cybersecurity: Crime, Fraud, and the Battle for Security in the Invisible World