সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ এবং ভবিষ্যৎ আমাদের: ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ
ব্লগের শিরোনাম: সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ এবং ভবিষ্যৎ আমাদের: ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবমুখী বিশ্লেষণ
১. ভূমিকা: আমাদের স্বপ্ন ও বর্তমানের বাস্তবতা
আজকের পৃথিবী এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির চরম উন্নতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। সম্পদ আজ মাত্র কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে বন্দি। এই বৈষম্য দেখে প্রগতিশীল তরুণ সমাজ মনে করে—সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ, এবং সেই ভবিষ্যৎ আমাদের। কিন্তু আমরা যখনই এই সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, তখনই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের নিজেদের দেশ ও রাজ্যের বর্তমান বাস্তবতা। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ আজ কেন সমাজতন্ত্রের পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? এটি কি সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা, নাকি ব্যবস্থার পরিবর্তন? আসুন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতিত্ব না করে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি।
২. বিশ্বমঞ্চে সমাজতন্ত্রের সফল বাস্তব উদাহরণ
সমাজতন্ত্র কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব নয়। বর্তমান পৃথিবীতে এর দারুণ কিছু সফল উদাহরণ রয়েছে:-
• স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেল: নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং ডেনমার্কের মতো দেশগুলো দেখিয়েছে কীভাবে ধনীদের ওপর চড়া ট্যাক্স বসিয়ে সেই টাকা দিয়ে নাগরিকদের জন্য শিক্ষা এবং চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা যায়।
• কিউবার স্বাস্থ্যসেবা: আমেরিকার মতো পরাশক্তির অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সমাজতান্ত্রিক কিউবা বিশ্বের অন্যতম সেরা চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে চিকিৎসা কোনো ব্যবসার পণ্য নয়।
• জলবায়ু সংকট মোকাবিলা: পুঁজিবাদ যেখানে মুনাফার লোভে জঙ্গল কেটে, নদী দূষণ করে পৃথিবী ধ্বংস করছে, সেখানে সমাজতন্ত্র পরিবেশ ও মানুষের জীবনকে ব্যবসার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
৩. ভারতের বাস্তব চিত্র: কেন দেশ সমাজতন্ত্র মানছে না?
ভারতের সংবিধানে (Preamble) কিন্তু স্পষ্ট অক্ষরে 'Socialist' (সমাজতান্ত্রিক) শব্দটি যুক্ত আছে। স্বাধীনতার পর শুরুর দিকে ভারত মিশ্র অর্থনীতির (Mixed Economy) মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচেই পথ চলা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন:
• ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কার (LPG): ১৯৯১ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে ভারত নিজের বাজারকে উদারীকরণ (Liberalization) ও বেসরকারিকরণের (Privatization) দিকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে দেশ দ্রুত পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকতে থাকে।
• ভোক্তাবাদ ও মিডল ক্লাস মানসিকতা: গত ৩০ বছরে ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজ বিশ্বায়নের ফলে সস্তা গ্যাজেট, গাড়ি বা কর্পোরেট চাকরির সুবিধা পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের 'ভোক্তাবাদী' (Consumerist) মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
• কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ: বর্তমান ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি বহুলাংশে বড় বড় কর্পোরেট হাউজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার ফলে সরকার কল্যাণকামী নীতি থেকে সরে এসে ব্যবসার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
৪. পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট: বামফ্রন্ট, তৃণমূল ও বিজেপির অর্থনৈতিক নীতি
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই রাজ্যের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা এবং বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার:-
• ক) ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট আমল (CPIM) - সাফল্য ও ব্যর্থতা:-
• সাফল্য: বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম বড় ঐতিহাসিক সাফল্য ছিল 'অপারেশন বর্গা' বা ভূমি সংস্কার। এর মাধ্যমে প্রায় ১৪ লক্ষ বর্গাদার বা প্রান্তিক চাষী জমির অধিকার পেয়েছিলেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমতা এনেছিল। এছাড়া পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল।
• ব্যর্থতা: নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ইউনিয়ন বাজি, উগ্র শ্রমিক আন্দোলন এবং নতুন প্রযুক্তির (যেমন কম্পিউটারের) প্রাথমিক বিরোধিতার কারণে রাজ্যে নতুন কোনো ভারী শিল্প আসেনি। একের পর এক কলকারখানা বন্ধ হওয়া এবং শেষদিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো জমি অধিগ্রহণ বিতর্কের কারণে কর্মসংস্থান মুখ থুবড়ে পড়ে, যা মানুষকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করে।
• খ) তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) ও তাদের সমাজকল্যাণমূলক নীতি:-
• তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকাল মূলত এক ধরণের 'পপুলিস্ট কল্যাণকামী নীতি' (Welfare Populism)-র ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
• তারা সরাসরি ভারী শিল্পের চেয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল তাদের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'। এছাড়া 'কন্যাশ্রী', 'খাদ্য সাথী' ও বিনামূল্যে রেশনের মতো জনমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে তারা প্রান্তিক মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে, যা দরিদ্র মানুষকে সাময়িক অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়েছিল।
• গ) ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং তাদের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি:-
• বিজেপি সরকার কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি রাজ্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তাদের অর্থনীতি পরিচালনার ধরণকে বিশ্লেষকরা মূলত 'নব্য-উদারতাবাদী পুঁজিবাদ' (Neoliberal Capitalism) ও সমাজকল্যাণের মিশ্রণ হিসেবে দেখেন।
• বিজেপি মূলত কর্পোরেট সেক্টরকে চাঙ্গা করা, ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করা (Ease of Doing Business), এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নে (Infrastructure) বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের নীতিতে বিশ্বাসী। তবে এর পাশাপাশি তাদেরও নিজস্ব বেশ কিছু বড় কল্যাণকামী স্কিম রয়েছে—যেমন 'পিএম কিষাণ যোজনা', 'আয়ুষ্মান ভারত' (ফ্রি চিকিৎসা), এবং 'প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা'। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই নীতি কর্পোরেট-বান্ধব হওয়ায় দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
• ঘ) ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি ও 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার':-
• ২০২৬ সালের মে মাসে রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর, বর্তমান সরকার পূর্বতন 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্পটিকে প্রতিস্থাপন করে 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' (Annapurna Bhandar Scheme) যোজনা চালু করেছে। এই নতুন প্রকল্পের অধীনে যোগ্য নারী উপভোক্তারা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।
• অর্থনৈতিক সংকট: দলমত নির্বিশেষে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের নগদ হস্তান্তর প্রকল্প বা ভাতার রাজনীতি গরিব মানুষকে সাময়িক সামাজিক সুরক্ষা ও স্বস্তি দিলেও এটি খাঁটি সমাজতন্ত্র নয়। আমজনতার ক্ষোভ প্রশমিত করতে এই ধরণের পপুলিস্ট বা কল্যাণকামী পুঁজিবাদের নীতি নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে রাজ্যের ঋণের বোঝা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। ভারী শিল্পের অভাব এবং কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ না থাকায় রাজ্যের শিক্ষিত তরুণদের এখনও বাধ্য হয়ে ভিন রাজ্যে কাজের সন্ধানে চলে যেতে হচ্ছে।
৫. উপসংহার: তবে কি ভবিষ্যৎ আমাদের নয়?
ভারত বা পশ্চিমবঙ্গে আজ সমাজতন্ত্রের জোয়ার হয়তো নেই, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সমাজতন্ত্র প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। পুঁজিবাদ বা ভাতার রাজনীতি মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী কর্মসংস্থান, সবার জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষা বা চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না।
যতদিন সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য থাকবে, তরুণ প্রজন্ম চাকরি না পেয়ে ঘুরে বেড়াবে, আর চিকিৎসার অভাবে সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হবে—ততদিন সমাজতন্ত্রের দাবি বারবার ফিরে আসবে। ইতিহাসের চাকা সবসময় এক জায়গায় থেমে থাকে না। আজকের তরুণ সমাজ যখন এই ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যগুলো বুঝতে পারবে, তখনই তারা নতুন এক সমতার সমাজ গড়তে এগিয়ে আসবে। তাই বুক বেঁধে বলাই যায়—সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ এবং ভবিষ্যৎ আমাদের।


Comments
Post a Comment